ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার শীর্ষ পদ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম তার ছেলে মোজতবা খামেনি। ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তার এই সময়ে তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের সূত্রে জানা গেছে।
উত্তরসূরি নির্ধারণে ভোটাভুটি
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব রয়েছে ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’-এর হাতে। রক্ষণশীল আলেমদের প্রাধান্য থাকা এই পরিষদ ইতোমধ্যে নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটি শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দ্রুতই এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন। এ ঘোষণার পর থেকেই তাকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে নিয়ে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে।
কঠোর অবস্থানের আশঙ্কা
ইরানের অনেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকের মতে, মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় এলে দেশটি আরও কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক পথে এগোতে পারে। তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং বাসিজ আধাসামরিক সংগঠনের সঙ্গে, যেগুলোকে ইরানের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল শক্তি হিসেবে ধরা হয়।
সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় মোজতবা খামেনি ব্যক্তিগতভাবেও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ওই হামলায় তার স্ত্রী, মা এবং আরও দুই আত্মীয় নিহত হন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যক্তিগত ক্ষতি তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোর করে তুলতে পারে।

অন্য সম্ভাব্য প্রার্থী কারা
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের আলোচনায় আরও কয়েকটি নাম সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি। অনেকের ধারণা, তিনি ক্ষমতায় এলে তুলনামূলক মধ্যপন্থী অবস্থান নিতে পারেন।
এছাড়া আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী আলিরেজা আরাফি। তিনি একজন কট্টরপন্থী আলেম এবং খামেনি নিহত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেয়েছেন। সামাজিক বিষয়ে তিনি আগের নেতৃত্বকেও অতিরিক্ত নরম মনে করতেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তীব্র সংঘাতের মাঝেই নেতৃত্ব পরিবর্তন
ইরান বর্তমানে বহু দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটি ও হোটেল, সৌদি আরবের তেল স্থাপনা এবং কুয়েতের পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মাঝেই নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে দেশের দায়িত্ব নিতে হবে। একই সঙ্গে তাকে সামাল দিতে হবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটও। চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাজারো বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি।
বিতর্কের কেন্দ্রেও মোজতবা
মোজতবা খামেনি ক্ষমতায় এলে তা ইরানের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় ধর্মীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার বাইরে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসছে আধাসামরিক গোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী আলেমরা।
তবে তাকে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হলে তা ইরানের ভেতরেও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, সেখানে বংশগত ক্ষমতার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, নতুন যে-ই সর্বোচ্চ নেতা হোক না কেন, তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















