চীনে দ্রুত গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিস্তার ঘটছে। এই প্রযুক্তির প্রভাব চাকরির বাজারে কতটা পড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সম্ভাব্য পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের অধিবেশন চলাকালে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী এই বিষয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে তারা মানুষের জীবিকা উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তবে আবাসনমন্ত্রী উপস্থিত না থাকায় স্থবির হয়ে পড়া সম্পত্তি বাজার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চাকরির ভবিষ্যৎ
চীন বর্তমানে নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের বিকাশ এবং দেশের ভোগব্যয় বৃদ্ধি করা।

মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ওয়াং শিয়াওপিং বলেন, দ্রুত বিকাশমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসংস্থানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং এটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
তার ভাষায়, বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত বিকশিত হচ্ছে এবং এটি কর্মসংস্থানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিষয়টি সবার জন্যই উদ্বেগের। সরকার এখন এমন নীতি নিয়ে কাজ করছে যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে নতুন চাকরি তৈরি করা যায় এবং প্রচলিত কাজের ক্ষেত্রগুলো আরও শক্তিশালী করা যায়। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর লক্ষ্য
চলতি বছরের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস অধিবেশন বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। এই অধিবেশনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা অনুমোদনের কথা রয়েছে।
এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীনের স্বনির্ভরতা অর্জন। যদিও উৎপাদন খাতে চীনের অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে, তবুও সমাজজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তৃত ব্যবহার তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

চলতি বছর প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করবে বলে জানিয়েছেন ওয়াং শিয়াওপিং।
তরুণদের বেকারত্বের চাপ
চীনে তরুণদের বেকারত্বের হার এখনও তুলনামূলক বেশি। শিক্ষার্থী নয় এমন ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে জানুয়ারিতে বেকারত্বের হার ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় গড় বেকারত্বের হার ছিল ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমবাজারকে মানিয়ে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মানুষের জীবনে রোবটের প্রবেশ
হায়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ঝৌ ইউনজি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবট আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বয়স্কদের সহায়তার মতো বিভিন্ন কাজে এসব রোবট ব্যবহার করা হবে। যদিও রোবট অনেক ক্ষেত্রে মানুষের শ্রমের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি নতুন উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার সুযোগও তৈরি করবে।

প্রযুক্তি খাতে দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষায় পরিবর্তন
চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রযুক্তিগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রী হুয়াই জিনপেং জানান, উন্নত প্রযুক্তি বিকাশের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর খাতে “এক শিক্ষার্থী, এক চিপ” কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এই কর্মসূচিতে প্রতিটি স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট চিপ নকশা প্রকল্পে যুক্ত করা হয়।
হুয়াই বলেন, শিক্ষিত তরুণরা উদ্যমী এবং তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তি রয়েছে। এই বিপুল মানবসম্পদই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

আবাসন বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা
সংবাদ সম্মেলনে আবাসন খাতের ধীরগতির বিষয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। গত দুই বছর নিয়মিত ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া আবাসন ও নগর-গ্রাম উন্নয়নমন্ত্রী নি হং এবার অনুপস্থিত ছিলেন।
২০২৬ সালের সরকারি কর্মপরিকল্পনা প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিক্রি না হওয়া বাড়িগুলোকে স্বল্পমূল্যের আবাসনে রূপান্তর করার মতো কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নতুন বাড়ি বিক্রি ২০২৬ সালেও কমতে পারে এবং টানা পঞ্চম বছরের মতো এই খাতে মন্দা অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন বাজার স্থিতিশীল করার বিষয়ে সরকারের নীতিগত নির্দেশনা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে এবং বাজারে দ্রুত পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও আপাতত কম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















