ইরানে যুদ্ধ, রাজনৈতিক দমন এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেও সিনেমা হয়ে উঠছে প্রতিবাদের ভাষা। দুই চলচ্চিত্র নির্মাতা—ইরানের মাহনাজ মোহাম্মাদি এবং ভারতের শ্রীময়ী সিং—তাদের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরছেন “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, বেদনা এবং প্রতিরোধের গল্প। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে এই দুই নির্মাতার কাজ নতুন করে আলোচনায় এনেছে ইরানের সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের সংগ্রামের বাস্তবতা।
ইরানের বাস্তবতা ও সিনেমার ভাষা
ইরানের চলচ্চিত্র জগতে রাজনীতি সব সময়ই একটি অন্তর্নিহিত বিষয়। সামাজিক বাস্তবতা, দমন এবং মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামই অনেক নির্মাতার গল্পের মূল সূত্র। এই প্রেক্ষাপটে মাহনাজ মোহাম্মাদির চলচ্চিত্র ‘রোয়া’ এবং শ্রীময়ী সিংয়ের নির্মাণ ‘বে কুচেয়েহে খোশবাখ্ত’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ আলোচনায় এসেছে।
এই দুই চলচ্চিত্রই প্রদর্শিত হয়েছে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে তাদের কাজ তুলে ধরেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের সমাজে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, বিশেষ করে নারীদের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের গল্প।
কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকে চলচ্চিত্র
মাহনাজ মোহাম্মাদি দীর্ঘদিন ধরে ইরানে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। নারীদের বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি তিনি পাঁচ বছর তেহরানের কুখ্যাত ইভিন কারাগারে বন্দি ছিলেন।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তার চলচ্চিত্র ‘রোয়া’র গল্পে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ছবিতে দেখানো হয়েছে এক ইরানি শিক্ষিকার জীবন, যিনি রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কারাগারে বন্দি। তাকে বাধ্য করা হয় টেলিভিশনে স্বীকারোক্তি দিতে। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন—স্বাধীনতার জন্য সত্য বলবেন, নাকি নীরব থেকে বন্দি জীবন বেছে নেবেন।
মোহাম্মাদির মতে, তিনি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র তৈরি করতে চান না। তবে তিনি বলেন, যখন মানুষের বাস্তব জীবন রাজনীতির দ্বারা চাপে পড়ে, তখন সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

চুল কাটা থেকে প্রতিরোধের প্রতীক
২০২২ সালে কেরালার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে একটি বিশেষ ঘটনা আলোচনায় আসে। সেখানে মোহাম্মাদিকে সম্মাননা দেওয়ার কথা থাকলেও তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তিনি নিজের কাটা চুল পাঠিয়েছিলেন অনুষ্ঠানে।
তার মতে, চুল কাটা শুধু ব্যক্তিগত প্রতীক নয়, বরং ইরানের নারীদের প্রতিদিনের সংগ্রাম এবং দমন-পীড়নের প্রতীক।
নারী আন্দোলনের নতুন ভাষা
ইরানে নারীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী মাসিহ আলিনেজাদের উদ্যোগে শুরু হওয়া সামাজিক আন্দোলন নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অনুপ্রাণিত করেছে।
এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে অনেক নারী প্রকাশ্যে হিজাব খুলে প্রতিবাদ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
এই বাস্তবতা চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজেও প্রতিফলিত হচ্ছে। শ্রীময়ী সিং মনে করেন, সমাজে বেঁচে থাকা এবং শ্বাস নেওয়ার মধ্যেও রাজনীতি জড়িয়ে থাকে। তাই শিল্পের প্রতিটি মাধ্যমই কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের মাঝেও স্বাধীনতার স্বপ্ন
ইরানে চলমান উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই চলচ্চিত্রগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নির্মাতারা মনে করেন, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়—এটি মানুষের কণ্ঠ, প্রতিবাদ এবং স্মৃতির ধারক।
মোহাম্মাদি বলেন, প্রতিরোধ মানে সব সময় শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, বরং অস্তিত্বকে মুছে যেতে না দেওয়া।
এই দর্শনই তার চলচ্চিত্রের মূল বার্তা—যুদ্ধ, দমন এবং ভয়ের মাঝেও মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















