মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উঠে এসেছে এক নতুন দৃঢ় কণ্ঠ। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি এখন যুদ্ধকালীন সময়ে তেহরানের প্রতিরোধের মুখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, বরং ‘আন্তর্জাতিক অত্যাচারীদের অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—ইরান পিছিয়ে আসবে না।
যুদ্ধের এই অস্থির সময়ে লারিজানির বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যুদ্ধের সূচনা ও আলোচনার অস্বীকৃতি
মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা শুরু করার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের নেতারা আবার আলোচনায় ফিরতে চান এবং তিনি আলোচনায় রাজি হয়েছেন।
কিন্তু তেহরান থেকে দ্রুতই ভিন্ন সুর শোনা যায়। আলি লারিজানি সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের জনগণের হৃদয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে এবং সেই আগুনের জবাব শত্রুরাও অনুভব করবে।
এরপরের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা জোরদার করে। পাল্টা জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যুদ্ধ থামানোর কোনো তাৎক্ষণিক আগ্রহ নেই বলেও জানায় ইরানের নেতৃত্ব। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করে।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে লারিজানির ভূমিকা
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে। ১৯৮৯ সালের সংবিধান সংশোধনের পর এই পরিষদ গঠিত হয় এবং এর প্রধান দায়িত্ব দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করা।
এই পরিষদের সচিব হিসেবে লারিজানি কার্যত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার পদটি অনেকটা একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সমতুল্য বলে ধরা হয়।
দর্শনের ছাত্র থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে
আলি লারিজানির শৈশব কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। তার বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ হাশেম আমোলি, যিনি শাহ শাসনের সময় নির্যাতন এড়াতে ইরাকের নাজাফে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই ১৯৫৮ সালে জন্ম হয় লারিজানির।
পরবর্তীতে পরিবার ইরানে ফিরে আসে এবং তিনি কোম শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন। পরে তেহরানের একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় তিনি পাড়ি জমান দর্শনের জগতে।
পাশ্চাত্য দর্শনের উপর গভীর গবেষণা করে তিনি জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের দর্শন নিয়ে একাধিক বই লেখেন। এছাড়া ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত এবং আধুনিক দর্শনের বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের নিয়েও গবেষণা করেছেন।
বিপ্লবের সৈনিক থেকে রাজনীতির কৌশলী
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে লারিজানি ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন। এই বাহিনীর সঙ্গে তার কাজই তাকে ধীরে ধীরে ইরানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে।
পরবর্তীতে তিনি সংস্কৃতি ও ইসলামিক দিকনির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং পরে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান হন। এই সময়েই তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠদের একজন হয়ে ওঠেন।
পরমাণু কূটনীতি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
২০০৫ সালে রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদের সরকারে লারিজানি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান এবং প্রধান পরমাণু আলোচক হন। তবে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কখনও কঠোর অবস্থান, কখনও কূটনৈতিক নমনীয়তার সংকেত দিয়েছেন।
২০০৭ সালে নীতিগত মতবিরোধের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন এবং পরে সংসদ রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘ সময় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে যখন ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তিতে পৌঁছায়, তখন সংসদে সেই চুক্তি পাস করাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
যুদ্ধের সময়ে কঠোর বার্তা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার পেছনে দীর্ঘদিনের কৌশল রয়েছে। ইরানের সামরিক কৌশলের অন্যতম স্থপতি ছিলেন কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হন।
সোলাইমানির হত্যার পর লারিজানি সতর্ক করে বলেছিলেন, এই ঘটনা অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেবে। তিনি দাবি করেছিলেন, সোলাইমানির রক্তের প্রতিশোধ হবে এমনভাবে যাতে মার্কিন বাহিনী অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হয়।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় তিনি আরও বলেন, যদি ইরানের ওপর আক্রমণ বাড়ে তবে দেশটি আত্মরক্ষার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে লারিজানি আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সেনারা এবং জনগণ আন্তর্জাতিক অত্যাচারীদের এমন শিক্ষা দেবে যা তারা কখনও ভুলতে পারবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















