পশ্চিম এশিয়ার আকাশ যেন এক সপ্তাহ ধরে আগুনে জ্বলছে। সীমান্ত পেরিয়ে বিস্তৃত এই সংঘাতে তেলবন্দর থেকে জনবহুল শহর—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে ধ্বংসের ছাপ। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, পাল্টা প্রতিশোধ আর ক্রমাগত উত্তেজনা বৃদ্ধির এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ সংঘর্ষ এখন বহু দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের আকাশে ধোঁয়া, ধ্বংসস্তূপে ভরা রাস্তা আর আতঙ্কে থাকা মানুষ—এই দৃশ্যই এখন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চলে।
যুদ্ধের সূচনা: তেহরানে ভয়াবহ হামলা
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে।
তেহরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কমপ্লেক্সে এই হামলা চালানো হয়। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ভবনটি, ছাদের উপর দিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ওয়াশিংটন দাবি করে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
শোক থেকে ক্ষোভ: রাস্তায় মানুষের ঢল
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইরানজুড়ে শোক ও ক্ষোভের ঢেউ দেখা দেয়। তেহরান থেকে বাগদাদ পর্যন্ত হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ইরানের পতাকা হাতে নিয়ে তারা শোকসভা ও প্রতীকী জানাজায় অংশ নেয়।
ইরাকের নাজাফ শহরেও আয়োজিত হয় প্রতীকী জানাজা। সেখানে জড়ো হওয়া মানুষের স্লোগানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পায়।
ইরানের পাল্টা হামলা: উপসাগরজুড়ে বিস্ফোরণ
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা প্রতিশোধ নেয়। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটির দিকে।
বাহরাইনে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি আরবের তেল স্থাপনার কাছে ভূপাতিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়, যার কারণে কিছু এলাকায় তেলসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্পাঞ্চলেও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এই সংঘর্ষের প্রভাব পৌঁছে যায় লেবাননেও, যেখানে ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহ জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ফলে যুদ্ধের বিস্তার আরও বড় আকার নিতে শুরু করেছে।

নিরীহ মানুষের মৃত্যু: যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য
যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। জেরুজালেমে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত তিন ভাইবোনকে দাফন করা হয়েছে শোকের পরিবেশে।
ইরানের মিনাব শহরে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। আরও প্রায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার দুইশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। লেবাননে প্রাণ হারিয়েছে দুই শতাধিক মানুষ এবং ইসরায়েলে নিহত হয়েছে অন্তত এগারো জন।
সাগরে নতুন বিপর্যয়
সংঘাতের প্রভাব স্থলভাগ ছাড়িয়ে সাগরেও ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রীলঙ্কার গলের উপকূলে ইরানের একটি নৌজাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। সাবমেরিন হামলার পর জাহাজটি ডুবে যায় এবং নাবিকদের উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
বিভিন্ন শহরে ধ্বংসস্তূপ
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাস্তা জুড়ে পড়ে আছে কংক্রিট, লোহা ও ভাঙা ভবনের টুকরো।
কাতারের রাজধানী দোহাতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের আশপাশের এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কিছু সময় পরই সেখানে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
সিরিয়ার কামিশলি শহরের বাইরে খোলা মাঠে একটি অবিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। আশপাশে খেলতে থাকা শিশুদের সেই দৃশ্য যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকেই সামনে এনে দেয়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে আতঙ্ক
এই সংঘর্ষ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তার ধাক্কা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















