মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতের কূটনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের কৌশল নতুনভাবে সাজাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা এখন বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান আরও জোরালো করতে চাইছে।
দীর্ঘদিন ধরে পাঁচটি সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে রাশিয়ার “পেছনের উঠান” হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ইরানকে ঘিরে সংঘাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দেশ তাদের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, তারা আর কেবল বড় শক্তির মাঝখানে থাকা একটি নিষ্ক্রিয় বাফার জোন হিসেবে থাকতে চায় না।
নাখচিভানে হামলার পর উত্তেজনা
৫ মার্চ আজারবাইজানের নাখচিভান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন হামলার পর পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। এর জেরে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন, তেহরান থেকে কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেন এবং সীমান্তপথে ট্রাক চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।
নাখচিভান একটি স্বশাসিত অঞ্চল, যা ভৌগোলিকভাবে মূল আজারবাইজান থেকে বিচ্ছিন্ন এবং আর্মেনিয়া, তুরস্ক ও ইরানের সীমান্তে অবস্থিত।
![]()
এই ঘটনার পর কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম–জোমার্ত তোকায়েভও কঠোর ভাষায় হামলার নিন্দা জানান। এতে বোঝা যায়, প্রতিবেশী দেশে হামলা এখন পুরো অঞ্চলের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উত্তেজনা ইরানের সঙ্গে স্থায়ী কৌশলগত বিচ্ছেদ তৈরি করবে না। বরং এটি মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে।
বড় শক্তির মধ্যে ভারসাম্যের কৌশল
নিউইয়র্কের বার্নার্ড কলেজের রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যাপক আলেকজান্ডার কুলি মনে করেন, মধ্য এশিয়ার নেতারা কোনো একক ভূরাজনৈতিক শিবিরে যুক্ত হওয়ার বদলে বিভিন্ন শক্তির কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের কৌশলই অব্যাহত রাখবেন।
তার মতে, বাইরের বিশ্লেষকেরা প্রায়ই বিষয়টিকে তুরস্ক বা পশ্চিমা কাঠামো বনাম চীনের সুরক্ষা বলয়ের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে মধ্য এশিয়ার নেতারা এভাবে সিদ্ধান্ত নেন না।
বরং তারা ভূরাজনৈতিক সংকটকে ব্যবহার করেন আলোচনায় আরও ভালো শর্ত আদায়ের সুযোগ হিসেবে।

বাণিজ্য রুটে নতুন গুরুত্ব
এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক পরিবহন ও বাণিজ্য রুটে। বিশেষ করে “মিডল করিডর” নামে পরিচিত বাণিজ্যপথটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই করিডর চীন থেকে মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগর ও দক্ষিণ ককেশাস হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া বা ইরান হয়ে যাওয়া পথগুলোতে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় এখন এই বিকল্প রুটকে আরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই পথে এখনও কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। যেমন কাস্পিয়ান সাগরে ফেরি পরিবহনের সীমিত সক্ষমতা এবং বিভিন্ন দেশের শুল্ক ব্যবস্থার জটিলতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুট পুরোপুরি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে আরও এক দশক সময় লাগতে পারে।
ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তাদের ইরান থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যেতে দিচ্ছে না।
কাজাখস্তানের কৃষি ও পরিবহন খাত ইরানের বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে বড় সুবিধা পায়। অন্যদিকে উজবেকিস্তান গত বছর ইরানের সঙ্গে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তুর্কমেনিস্তানের ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও গভীর। দেশটির জ্বালানি খাতের সঙ্গে ইরানের সরাসরি অবকাঠামোগত সংযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের সঙ্গে তুর্কমেনিস্তানের বড় গ্যাস চুক্তিটিও ইরানের ভেতর দিয়ে যাওয়া পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে নতুন বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি না করা পর্যন্ত তুর্কমেনিস্তানের রপ্তানি থেকে ইরানের প্রভাব পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক
লানঝো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঝু ইয়ংবিয়াও মনে করেন, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ইরান থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তার মতে, এসব দেশ ইরানের প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মধ্য এশিয়ার সরকারগুলো এখন চীনের ধারাবাহিক সমর্থনকে এক ধরনের নিরাপত্তা ভরসা হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে তারা কখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে বা অন্য শক্তির সঙ্গে কৌশলগত অবস্থান নিতে আরও আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে।
তবে এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।
বাফার জোন হতে না চাওয়ার মনোভাব

ওয়াশিংটনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ফ্লোর স্ট্র্যাটেজিসের প্রেসিডেন্ট উইল্ডার আলেহান্দ্রো সানচেজ বলেন, মধ্য এশিয়া বহু বছর ধরে প্রতিবেশী অঞ্চলের সংঘাতের মধ্যে পথ খুঁজে চলেছে—আফগানিস্তান থেকে দক্ষিণ ককেশাস পর্যন্ত।
তার মতে, এই অভিজ্ঞতার কারণেই পাঁচটি দেশ নিজেদের আর বড় শক্তির মধ্যে থাকা নিষ্ক্রিয় বাফার জোন হিসেবে দেখতে চায় না।
তারা তিন দশকের বেশি সময় ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমান মর্যাদা চায়।
নিরাপত্তা ও নতুন অংশীদার
এই পরিবর্তন নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত কয়েক বছরে রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি কমে গেছে, যা আগে মধ্য এশিয়ার প্রধান প্রতিরক্ষা উৎস ছিল।
ফলে এসব দেশ এখন নতুন সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকছে, যা রাশিয়ার ঐতিহাসিক নিরাপত্তা প্রভাবকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে।

এই সুযোগে বড় শক্তিগুলোও অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র গত বছর জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে হোয়াইট হাউসে একটি শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের প্রভাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনও কঠিন।
চীনের সতর্ক কৌশল
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন এ অঞ্চলে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।
এই কৌশলকে অনেকেই “পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোনো” নীতি হিসেবে বর্ণনা করেন—যেখানে চীন অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ায়, কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









