বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন অর্থনৈতিক জোট গঠনে সক্রিয় হয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তবে এই কৌশলই এখন তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। কারণ, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় তিনি এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছেন, যাদের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
বৈশ্বিক মঞ্চে নতুন বার্তা
দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া এক বক্তব্যে মার্ক কার্নি বলেন, পুরনো নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে গেছে এবং দেশগুলোকে এখন নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই অবস্থান থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন জোট তৈরির উদ্যোগ নেন। চলতি বছর তিনি একাধিকবার বিশ্ব সফর করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

বিতর্কিত দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
চীন, ভারত ও কাতারের মতো দেশের সঙ্গে কার্নির ধারাবাহিক বৈঠক ইতিমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। চীনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি নিয়ে সমঝোতার বিপরীতে কানাডার কৃষিপণ্যে শুল্ক কমানো হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ইউরেনিয়াম রপ্তানির বড় চুক্তি হয়েছে, আর কাতার কানাডার অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে এই দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। চীনে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন, ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ এবং কাতারে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নারীর অধিকার সীমিত থাকার বিষয়গুলো সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার ইস্যুতে নীরবতা
অতীতে কানাডা মানবাধিকার রক্ষায় বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিয়েছে বলে পরিচিত। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে আসছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, কার্নি এসব সংবেদনশীল বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলছেন। তার বক্তব্যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর থাকলেও মানবাধিকার প্রসঙ্গ অনেকটাই অনুপস্থিত।

কৌশল না আপস?
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ধরনের বাস্তববাদ আসলে একটি সমঝোতা, যা কানাডার নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অ্যাক্সওয়ার্থিও হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, অতীতে কানাডা বাণিজ্য ও মানবাধিকার—দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য বজায় রাখত। এখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও নতুন দিক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কও কার্নির কৌশলকে প্রভাবিত করছে। ওয়াশিংটনের চাপ ও অর্থনৈতিক হুমকির প্রেক্ষাপটে কানাডা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় দেশটি তার দীর্ঘদিনের মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে গিয়ে কানাডা যদি মানবাধিকার ইস্যু উপেক্ষা করে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। নতুন জোটের এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কানাডার জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









