নিউইয়র্কের রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটানো মেয়র জোহরান মামদানি নিজেকে জনসমক্ষে এক হাস্যোজ্জ্বল, আদর্শবাদী নেতা হিসেবে তুলে ধরলেও, পর্দার আড়ালে তার রাজনৈতিক কৌশল অনেক বেশি কঠোর, হিসেবি এবং কখনো নির্মম বলেই উঠে আসছে ঘনিষ্ঠ মহলের বর্ণনায়। তার এই দ্বৈত চরিত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রে, যেখানে ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং নিজের এজেন্ডা এগিয়ে নিতে তিনি আপসহীন ভূমিকা নিচ্ছেন।
ক্ষমতার পথে কঠোর বার্তা
গত বছরের নির্বাচনের আগে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তার এই চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তরুণ কাউন্সিলম্যান চি ওসের কংগ্রেসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনার খবর পেয়ে মামদানি সরাসরি ফোন করে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই লড়াই বামপন্থীদের জন্য ক্ষতিকর হবে এবং ওসের পক্ষে জেতা সম্ভব নয়।
এরপর তিনি রাজনৈতিক প্রস্তাবের পাশাপাশি চাপ প্রয়োগ করেন। সহযোগিতা করলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনার ইঙ্গিত দেন, আর না মানলে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন। ফোনালাপের পরই তার বিজয় উদযাপনের আমন্ত্রণ বাতিল হওয়া ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

হাসির আড়ালে কৌশলী রাজনীতি
মাত্র ৩৪ বছর বয়সে দ্রুত উত্থান ঘটানো এই নেতা নিজেকে সবসময় এক ‘খুশি যোদ্ধা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠদের মতে, এই ইমেজের আড়ালে রয়েছে এক কৌশলী এবং বাস্তববাদী রাজনীতিক, যিনি প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গেও সংঘাতে যেতে দ্বিধা করেন না।
অনেকেই মনে করছেন, তার এই পদ্ধতি বামপন্থী শিবিরের ভেতরেই বিভাজন তৈরি করছে। যদিও অনেকে এটিকে তার শক্তিশালী নেতৃত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে তিনি হারতে পারে এমন লড়াইয়ে সময় নষ্ট করতে চান না।
ক্ষমতা ধরে রাখতে আপসের রাজনীতি
রাজ্য গভর্নরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে মামদানি নিজের পুরোনো অবস্থান থেকেও সরে এসেছেন। একসময় সমালোচনা করলেও এখন তিনি প্রকাশ্যে কোনো সংঘাতে না গিয়ে বরং গভর্নরের পক্ষে কাজ করছেন। এমনকি দলীয় সমর্থন ঠেকাতে তিনি নিজেই দলীয় নেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন, যাতে রাজনৈতিক সমীকরণ তার অনুকূলে থাকে।

এই কৌশলের ফলও তিনি পেয়েছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সরে দাঁড়ালে গভর্নরের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়, যা মামদানির রাজনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মিত্রদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব
শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছে। একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, তিনি নিজের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে নিতে পুরোনো মিত্রদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এতে বামপন্থী শিবিরের ভেতরে নতুন করে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
একজন প্রবীণ নেত্রীর অবসর ঘোষণার পর উত্তরসূরি নির্ধারণে তার হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ফলে যে প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার কথা ছিল, তা এখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে।

জনসমর্থন বনাম ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ
মামদানির ঘনিষ্ঠদের একাংশ মনে করেন, তিনি নিজের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। আবার অন্যরা বলছেন, তিনি বাস্তবতা বুঝে কৌশল নিচ্ছেন, যাতে তার নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা যায়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, জনসমক্ষে হাস্যোজ্জ্বল মুখের আড়ালে তিনি ক্ষমতার রাজনীতিতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









