বর্তমান বিশ্ব জ্বালানি খাত এখন এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ইরান-বিরোধী সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা বিশ্বের মোট এলএনজি উৎপাদনের পঞ্চম অংশ সরবরাহ করে। এই সংকটের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এলএনজির উপর নির্ভরশীল দেশগুলো দিশাহীন হয়ে পড়েছে। ধনী দেশগুলো যেখানে সীমিত পরিমাণ এলএনজি পেতে তোলপাড়মূলক দাম দিচ্ছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলো স্কুল বন্ধ করা, ব্যবসার কাজের সময় কমানো বা বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বাজারে ফের জনপ্রিয়তা পাচ্ছে কয়লা
এই সংকটের মধ্যে কয়লা আবারও শক্তি বাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পুরোনো কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর চলমান বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। আগে পরিবেশবান্ধবতার কারণে এই চুল্লিগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করা হচ্ছিল। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লার আমদানি বৃদ্ধি করেছে এবং ভারত থেকেও কয়লাচালিত বিদ্যুতের আমদানি শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে রপ্তানি হওয়া কয়লার দাম ফেব্রুয়ারির শেষের পর থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রমাণ করে কয়লা আবার শক্তি বাজারে ‘নতুন কালো’ হিসেবে ফিরে এসেছে।
কেন এখনও দাম আকাশছোঁয়া নয়?
এক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এলএনজি সংকট থাকা সত্ত্বেও কয়লার দাম কেন এতটা বাড়েনি। এর পিছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বিশ্বের মোট কয়লার মাত্র ১৭ শতাংশই আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে বিক্রি হয়, যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির প্রায় সমস্ত পরিমাণ সীমান্ত পেরিয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল থাকে। এছাড়া এশিয়ার বড় দেশগুলো—চীন এবং ভারত—প্রচুর কয়লা খনন করে এবং প্রয়োজনে কয় মাসের মধ্যে খনি উৎপাদন বাড়িয়ে এলএনজি ঘাটতি পূরণ করতে পারে। এছাড়া এই দেশগুলোতে অনেক কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনও নিষ্ক্রিয় হলেও দ্রুত চালু করা সম্ভব।
এশিয়ার শক্তি প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ চিত্র
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে এশিয়ার বড় এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোতে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান এখন পুনরায় কয়লার উপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে। ফিলিপাইনের শক্তি সচিব পর্যন্ত ঘোষণা দিয়েছেন যে দেশটি আগামীতে কয়লাচালিত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়াবে। অস্ট্রেলিয়ার কয়লার দাম ইতিমধ্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী দিকনির্দেশনা
যদি উপসাগরীয় এলএনজি আবার শীঘ্রই বাজারে না আসে, তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে, সস্তা এবং পরিচ্ছন্ন পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি শক্তিই শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে। যতক্ষণ না তা সম্ভব, ততক্ষণ পর্যন্ত কয়লা এই শক্তি সংকটের মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে থাকছে। তবে এটি সবচেয়ে নোংরা জ্বালানি হওয়ায়, দেশের শক্তি নীতি এবং পরিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখে শিগগিরই উন্নত ও নিরাপদ শক্তির দিকে মনোনিবেশ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















