ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সামরিক অভিযানের সময়কাল যদি চীনের শাসকগোষ্ঠী নির্ধারণ করতে পারত, তবে তাদের পছন্দ হতো সংক্ষিপ্ত একটি যুদ্ধ। বেইজিংয়ের এক নীতিনির্ধারক উপদেষ্টার মতে, খুব দীর্ঘ সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তেমনি চীনের জন্যও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করবে।
চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে একটি অভিন্ন ধারণা গড়ে উঠেছে—এই যুদ্ধ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রদর্শন, অন্যদিকে নিজের জন্যই ক্ষতির পথ খুলে দেওয়া। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সমুদ্রপথে বাধা এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা চীনের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধ নিয়ে চীনের সতর্ক দূরত্ব
চীনা অভিজাতদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হলো, ইরান যুদ্ধের সময়কাল বা পরিণতিতে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। যদিও এই অবস্থান অনেকের কাছে নিষ্ক্রিয় মনে হতে পারে, তবুও বেইজিংয়ের কৌশলগত চিন্তায় এটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
চীনা বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারা এমন একটি যুদ্ধে অংশ নেবে না, যা তারা নীতিগতভাবে সমর্থন করে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানকে তারা গুরুত্ব দেয়নি। অতীতে ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে চীন বরং নিজেদের তেল মজুত সক্ষমতা বাড়িয়েছে, যা এখন বহু মাসের জ্বালানি চাহিদা পূরণে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা
চীনের বিশ্লেষকদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন অস্থির ও অনির্দেশ্য শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, গণতন্ত্রের নামে আগের মতো হস্তক্ষেপ না করে এখন সরাসরি সম্পদের জন্য যুদ্ধ করছে ওয়াশিংটন।
অনেক ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো চীনা বিশ্লেষকদের কাছে অসংগতিপূর্ণ মনে হয়েছে। ইরানের মধ্যপন্থী নেতাদের হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতা এবং একই সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ—এই দ্বৈত অবস্থান তাদের কাছে বিভ্রান্তিকর।

ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ
চীনা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে দুর্বল করার পরিকল্পনা করছেন এবং ট্রাম্পকে সেই পথে প্রভাবিত করছেন। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ লবির প্রভাবও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে।
জনমত ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান
চীনের সরকারি অবস্থান স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনামূলক। তারা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে শান্তির আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বেশি তুলে ধরা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে। ইরানে বোমা হামলার ভিডিও দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছে—কেন যুদ্ধের প্রথম শিকার হয় সাধারণ মানুষই?
প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তি নিয়ে উদ্বেগ
চীনের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে লক্ষ্য নির্ধারণ ও যুদ্ধ পরিচালনা—এই সক্ষমতা চীনকে নতুন করে ভাবাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেত্রে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে আরও সময় লাগতে পারে।

অর্থনৈতিক সুযোগ ও ভবিষ্যৎ কৌশল
যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে চীন পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী সবুজ প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
ট্রাম্প নীতি নিয়ে চীনের হিসাব
চীনের অভিজাতদের একাংশ মনে করে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধ তার নিজের নেতৃত্বকেই দুর্বল করছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেও অস্থির করে তুলছে। তবে আরও বাস্তববাদী বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—চীন এখনো বৈশ্বিক বাণিজ্য, উন্মুক্ত সমুদ্রপথ এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তাদের মতে, শুধু পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিশ্বে টিকে থাকতে চীনকে আরও কৌশলী হতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















