চুক্তি হয়েছে, আস্থা হয়নি
৮ এপ্রিল ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কয়েক দিন ধরে দ্রুত বেড়ে ওঠা সামরিক উত্তেজনা, বড় ধরনের হামলার হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের পর এই ঘোষণাটি কিছুটা স্বস্তি এনেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বৃহৎ আক্রমণ আপাতত ঠেকেছে এবং অঞ্চলজুড়ে আতঙ্কও সাময়িকভাবে কমেছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই স্বস্তি অসম্পূর্ণ ছিল।
কারণ যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন হামলার খবর সামনে আসে। এখানেই বোঝা যায়, এই চুক্তি কাগজে যতটা স্পষ্ট, বাস্তবে ততটা নয়। যুদ্ধবিরতির মূল শক্তি থাকে এতে জড়িত পক্ষগুলো কতটা আন্তরিকভাবে সেটিকে মানতে চায়। ৮ এপ্রিলের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, অন্তত প্রথম দিনে সেই আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। সব পক্ষই সাময়িক বিরতির কথা বলছে, কিন্তু বিরতির অর্থ, সীমা এবং পরবর্তী ধাপ নিয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য চোখে পড়ছে না।
এখানেই এই ঘটনার আসল গুরুত্ব। যুদ্ধবিরতি মানে কেবল গুলি থামা নয়; এটি এমন একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত, যেখানে সামরিক গতি থামিয়ে আলোচনার জানালা খোলা যায়। বাজারে আতঙ্ক কমানো যায়। বেসামরিক মানুষের ওপর চাপ কিছুটা লাঘব করা যায়। কিন্তু যদি যুদ্ধবিরতিকে সবাই কেবল সময় কেনার উপায় হিসেবে দেখে, তাহলে সেটি খুব দ্রুতই আরেক দফা সংঘাতের সেতুতে পরিণত হয়। ৮ এপ্রিলের প্রথম সংকেতগুলো সেই ঝুঁকিই সামনে এনেছে।
চুক্তির দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয় এ কারণে যে মূল বিরোধগুলোর একটিও এখনো মীমাংসিত হয়নি। ওয়াশিংটন বড় আক্রমণের পথ থেকে আপাতত সরে এসেছে। ইসরায়েলও সাময়িক বিরতিতে ঢুকেছে। কিন্তু ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে তার কৌশলগত অবস্থান কিংবা পারমাণবিক প্রশ্নে তারা সহজে নতি স্বীকার করছে না। অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি হয়েছে, কিন্তু সংঘাতের মূল চালিকাশক্তিগুলো এখনো অমীমাংসিত।

এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ এবং এশিয়ার বহু সরকার পরিস্থিতিকে খুব সতর্কভাবে দেখছে। কারণ এই সংকট শুধু সামরিক নয়; এটি জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু যদি সেটি নড়বড়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি নতুন বিস্ফোরণ, ক্ষেপণাস্ত্র বা সীমিত সংঘর্ষই আবার বড় ভয় তৈরি করবে। এই নাজুক অবস্থায় প্রতিটি ছোট ঘটনা বড় অর্থ বহন করে।
এখন কী দেখার
পরবর্তী কয়েক দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এই কারণে যে তখন বোঝা যাবে যুদ্ধবিরতিটি শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি এটি আলোচনার প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। তার জন্য দরকার হবে বাস্তবে হামলা কমা, জনসমক্ষে বক্তব্যের স্বর কিছুটা সংযত হওয়া, এবং অন্তত কিছু মৌলিক বিষয়ে কূটনৈতিক কথা শুরু হওয়া। এসব কিছু না হলে এই বিরতি খুব সহজেই এক ধরনের সামরিক পুনর্বিন্যাসে পরিণত হতে পারে।
তবু এই চুক্তিকে হালকাভাবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ এর বিকল্প ছিল আরও বিপজ্জনক। আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছিল। তেলের বাজার উদ্বিগ্ন ছিল। সাধারণ মানুষ আরও বড় অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে তুলনায় এই বিরতি অন্তত এমন একটি মুহূর্ত এনে দিয়েছে, যেখানে সব পক্ষ এখনো শেষ সীমা থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
৮ এপ্রিলের চিত্র তাই দ্বিমুখী। একদিকে কূটনীতি একটি দরজা খুলেছে। অন্যদিকে সহিংসতার বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে, সেই দরজা এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। আসল প্রশ্ন এখন একটাই—এই বিরতি কি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে, নাকি আবারও বিস্ফোরণের আগে সাময়িক বিরতি হিসেবেই মনে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















