বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার কমছে তা-ই নয়, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, ঋণচাপ এবং বৈশ্বিক ঝুঁকি—সবকিছু একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধি কমে মহামারী-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে পৌঁছায়।
ধীরগতির এই চিত্রকে বিশ্বব্যাংক শুধু সাময়িক দুর্বলতা হিসেবে দেখছে না। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি টানা তৃতীয় বছরের মন্থরতা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানিনির্ভর আমদানি ব্যয়ের চাপ অর্থনীতির ভেতরের ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রবৃদ্ধি কমার বড় কারণ কোথায়
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে বড় ধাক্কার পর পরের অংশে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুরো বছরের চিত্র দুর্বলই থেকেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, এই ধীরগতির মূল কেন্দ্র ছিল বিনিয়োগে ভাটা। মোট বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশে।
এখানেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংকেতটি হলো বেসরকারি খাতে আস্থার অভাব। বিশ্বব্যাংক বলছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, কাঁচামালের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষার কৌশল নিয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে বেসরকারি ঋণপ্রবাহেও। ২০২৫ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে আসে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৫ শতাংশে।
কেন এই পূর্বাভাস উদ্বেগের
৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য শুধু একটি সংখ্যা নয়। এর অর্থ হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যাওয়া, পরিবারগুলোর আয়চাপ বাড়া এবং দারিদ্র্যে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের দারিদ্র্য মূল্যায়নও বলছে, ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত দারিদ্র্য কমলেও অগ্রগতির গতি ২০১৬ সালের পর থেকে মন্থর হয়েছে। এখনও দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।
অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমে গেলে তার ধাক্কা শুধু সামষ্টিক অর্থনীতিতে থেমে থাকবে না; এটি সরাসরি চাকরি, ভোগব্যয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় গিয়ে লাগবে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্থিতিশীল কর্মসংস্থানই দারিদ্র্য কমার সবচেয়ে বড় পথ, সেখানে দীর্ঘস্থায়ী মন্থরতা সামাজিক চাপও বাড়াতে পারে।

মূল্যস্ফীতি কমেনি, বরং ঝুঁকি রয়ে গেছে
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানেই রয়ে গেছে। তাদের বিশ্লেষণে জ্বালানির দামকে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চালক বলা হয়েছে, আর বিনিময় হারকে দ্বিতীয় বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়া বা টাকার ওপর নতুন চাপ তৈরি হলে দেশের বাজারে আবারও মূল্যস্ফীতি তীব্র হতে পারে।
এই ঝুঁকির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি, কঠোর মুদ্রানীতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ সম্পর্কে দেওয়া পূর্বাভাসও এই অনিশ্চয়তার ভেতরেই উঠে এসেছে।
রাজস্ব, ঘাটতি ও ঋণচাপ কেন বাড়ছে
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের আর্থিক অবস্থানও কঠিন হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে, যা আগের বছরে ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। রাজস্ব আহরণ দুর্বল ছিল, আর ভর্তুকি ও সুদব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নও নেমে গেছে বহু বছরের নিম্নস্তরে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ঋণপরিশোধের চাপ। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের যৌথ বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির অবস্থান নিম্ন থেকে মধ্যমে উন্নীত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্বের তুলনায় ঋণপরিশোধের চাপ ১০০ শতাংশেরও ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ সরকার যে অর্থ সংগ্রহ করছে, তার তুলনায় ঋণসেবার বোঝা অস্বাভাবিক রকম বড় হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাবে পার্থক্য কেন
বিশ্বব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে বললেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের জন্য ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ২০২৬ সালের জন্য ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আভাস দিয়েছে।
এই পার্থক্য দেখায় যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে নীতিগত গতি, রাজনৈতিক স্থিতি, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর। বিশ্বব্যাংক তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, কারণ তারা বর্তমান বিনিয়োগ স্থবিরতা, রাজস্ব দুর্বলতা এবং বহিরাগত ঝুঁকিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন কী করণীয়
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে জরুরি সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন। কারণ প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে শুধু রপ্তানি বা ভোগব্যয় যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে হবে উদ্যোক্তা, ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তা—সব পক্ষের মধ্যে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও ভেঙে পড়ার অবস্থায় নেই, কিন্তু গতি হারানোর সংকেত স্পষ্ট। প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, বিনিয়োগে স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ চাপ, রাজস্ব দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—সংস্কার ও স্থিতিশীলতার পথে দ্রুত ফেরা সম্ভব হবে কি না। সেই উত্তরই ঠিক করবে, এই মন্থরতা সাময়িক থাকবে, নাকি আরও গভীর অর্থনৈতিক চাপের শুরু হবে।
Sarakhon Report 



















