পাকিস্তানে কয়েক বছর ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের যে প্রবণতা ছিল, তা উল্টে গিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশটির ২০২৫-২৬ অর্থনৈতিক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৮.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় নেমে এসেছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৮ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
জরিপ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাকিস্তানের দারিদ্র্যের হার ছিল ২১.৯ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির কারণে সেই অগ্রগতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
দারিদ্র্যের চিত্র আরও গভীর
অর্থনৈতিক জরিপে বলা হয়েছে, দারিদ্র্যসীমাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৮-১৯ সালে যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মাসিক দারিদ্র্যসীমা ছিল ৩ হাজার ৭৫৮ রুপি, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৮৪ রুপিতে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। সেখানে দারিদ্র্যের হার ২৮.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬.২ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এই হার ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭.৪ শতাংশ হয়েছে।
প্রাদেশিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য দেখা গেছে বেলুচিস্তানে, যেখানে ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় এই হার ৩৫.৩ শতাংশ, সিন্ধুতে ৩২.৬ শতাংশ এবং পাঞ্জাবে ২৩.৩ শতাংশ।
আয়ের বৈষম্যও বেড়েছে
জরিপে আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। বৈষম্য পরিমাপের সূচক গিনি সহগ ২০১৮-১৯ সালের ২৮.৪ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে ৩২.৭ হয়েছে। শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলে এই বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রদেশগুলোর মধ্যে সিন্ধুতে আয়ের বৈষম্য সবচেয়ে বেশি, যার গিনি সহগ ৩৫.৯।
বাহ্যিক ধাক্কার আশঙ্কা
জরিপে সতর্ক করা হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দেশটির প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রবাসী আয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সংকট দেখা দিলে তা প্রবাসী আয়, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) একটি মূল্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদি আঞ্চলিক অস্থিরতাও লাখো মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংকোচন
অর্থনৈতিক জরিপে শিক্ষা খাতের চিত্রও উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২৫ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ৯৬২ বিলিয়ন রুপি, যা আগের প্রতিবেদিত বছরের ১ হাজার ২৫১ বিলিয়ন রুপি থেকে ২৩ শতাংশ কম।
সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে পাঞ্জাবে। সেখানে শিক্ষা বাজেট ৪৯২.৭ বিলিয়ন রুপি থেকে কমে ১৭৮ বিলিয়ন রুপিতে নেমে এসেছে। খাইবার পাখতুনখোয়াতেও ব্যয় ৬২.৬ শতাংশ কমেছে। তবে সিন্ধু ও বেলুচিস্তানে শিক্ষা ব্যয় যথাক্রমে ৪০ ও ৪৯ শতাংশ বেড়েছে।
অবকাঠামোগত সংকট রয়ে গেছে
জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তানের সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৬৩ শতাংশ। নারীদের সাক্ষরতার হার ৫৪ শতাংশ। যদিও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর হার ৩৮ শতাংশ থেকে কমে ২৮ শতাংশে নেমেছে, তবুও প্রায় প্রতি তিনজন শিশুর একজন এখনও বিদ্যালয়ের বাইরে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিস্থিতিও দুর্বল। দেশজুড়ে মাত্র ৫৯ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে। বেলুচিস্তানে এই হার মাত্র ২১ শতাংশ। একই অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মাত্র ০.৩ শতাংশে শৌচাগার সুবিধা রয়েছে।
জরিপে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে প্রবেশাধিকার, মান, শেখার ফলাফল, সমতা ও সুশাসন উন্নত করতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এবং সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। তবে বর্তমানে জিডিপির মাত্র ০.৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করে পাকিস্তান আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
#পাকিস্তান #দারিদ্র্য #শিক্ষা_ব্যয় #পাকিস্তান_অর্থনীতি #মূল্যস্ফীতি #দক্ষিণএশিয়া #অর্থনৈতিক_জরিপ #মানবসম্পদ_উন্নয়ন #সারাক্ষণ_রিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















