নিরাপত্তারক্ষী ধরে রাখা এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মী ছেড়ে যাওয়ার হার বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রোবট কুকুর, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর টহল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প নয়; বরং নিরাপত্তারক্ষীদের ঝুঁকিপূর্ণ ও একঘেয়ে কাজ কমিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করছে।
কর্মী ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় সমস্যা
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন কর্মী নিয়োগের প্রধান কারণ নতুন পদ সৃষ্টি নয়, বরং চাকরি ছেড়ে যাওয়া কর্মীদের স্থান পূরণ করা।
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিরাপত্তা খাতে কর্মী পরিবর্তনের হার অত্যন্ত বেশি। কম বেতন, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং কাজের উচ্চ ঝুঁকির কারণে অনেকেই দীর্ঘদিন এই পেশায় থাকতে চান না। বর্তমানে একজন নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যম ঘণ্টাপ্রতি আয় প্রায় ১৮ দশমিক ৭০ ডলার। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মীর স্বাস্থ্যবিমাও নেই।
কীভাবে কাজ করছে রোবট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাসাইলন রোবোটিক্স বড় কারখানা, গুদাম, ক্রীড়া স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ও রোবট কুকুর মোতায়েন করছে।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এসব রোবট এলাকাজুড়ে টহল দেয়, সরাসরি ভিডিও পাঠায় দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণকক্ষে এবং কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা শনাক্ত করলে মানব অপারেটর সেটি যাচাই করেন। প্রয়োজনে এরপর ঘটনাস্থলে নিরাপত্তারক্ষীদের পাঠানো হয়।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ডেমন হেনরির ভাষ্য, বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের বিনিময়ে তারা সম্পূর্ণ সেবা দেয়, যার মধ্যে রোবট, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দূরবর্তী অপারেটর অন্তর্ভুক্ত থাকে। তার দাবি, সার্বক্ষণিক মানব নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েনের তুলনায় এটি অনেক ক্ষেত্রেই কম ব্যয়বহুল।
রাতের ঝুঁকিপূর্ণ টহলে রোবটের ব্যবহার
অনেক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে রাতের পালায় নিরাপত্তারক্ষী পাওয়া বা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে টহলে বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়।
এই সমস্যার সমাধানে রোবট কুকুর ও ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো নিয়মিত টহল দেয়, নিরাপত্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং অ্যালার্ম বাজলে পরিস্থিতি যাচাই করে। একাধিক স্থানে থাকা কয়েকটি রোবট একসঙ্গে একজন দূরবর্তী অপারেটর তদারকি করতে পারেন।

স্টেডিয়ামে ইতিবাচক ফল
আটলান্টার একটি বড় ক্রীড়া স্টেডিয়ামে ব্যবহৃত রোবট কুকুর ‘বেনজি’ মূলত বাইরের এলাকায় টহল দেয়। এর ফলে গভীর রাতে নিরাপত্তারক্ষীদের একা বাইরে ঘোরার প্রয়োজন অনেকটাই কমেছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রোবট মোতায়েনের কয়েক মাসের মধ্যেই সেখানে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা শূন্যে নেমে আসে এবং সেই অবস্থা বজায় রয়েছে।
মানুষের কাজ এখনো অপরিহার্য
যদিও প্রযুক্তির অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে, তবুও রোবট এখনো পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। জটিল পথ, দরজা, মানুষের ভিড় বা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে অনেক সময় দূরবর্তী মানব অপারেটরের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়া সন্দেহজনক কোনো ঘটনা শনাক্ত হলেও শেষ পর্যন্ত একজন মানুষই তা যাচাই করেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন।

সীমাবদ্ধতাও রয়েছে
সব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা অবশ্য একই রকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবন্দরে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত একটি নিরাপত্তা রোবট মানুষের ভিড়ের মধ্যে চলাচল, পরিচয়পত্র শনাক্ত করা এবং নির্ভরযোগ্যভাবে ভিডিও ও শব্দ পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এটি দেখায়, বাস্তব পরিবেশে কাজ করার ক্ষেত্রে এখনো রোবটের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তারক্ষীদের সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় প্রযুক্তি এখনো পৌঁছায়নি। বরং রোবট একঘেয়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ টহলের কাজ করবে, আর মানুষ সংঘাত নিরসন, জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিকে সহায়তা করা এবং অন্যান্য জটিল পরিস্থিতি সামলানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।
তাদের মতে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মানুষ ও রোবট একসঙ্গে কাজ করবে, যেখানে প্রযুক্তি নিরাপত্তারক্ষীদের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নিরাপত্তারক্ষী সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রোবট কুকুর ও ড্রোন ব্যবহার বাড়াচ্ছে। প্রযুক্তি ঝুঁকি কমালেও মানুষের সিদ্ধান্ত ও উপস্থিতি এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















