কোনো সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য শুধু সিদ্ধান্তটি কী—সেটি দেখলেই হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কী ধরনের যাচাই হয়েছে, কার আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে এবং একই ধরনের ঝুঁকির ক্ষেত্রে সরকার কতটা সমান মানদণ্ড প্রয়োগ করছে।
থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে ব্যাংককের বর্জ্য সংগ্রহে ডিজেলচালিত ট্রাকের বদলে বৈদ্যুতিক ট্রাক চালুর পরিকল্পনা এবং দেশজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘টিএইচ-এআই পাসপোর্ট’ প্রকল্প—দুটি উদ্যোগই আধুনিকায়নের নামে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুটির ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও সতর্কতার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা গেছে, সেটিই আসল আলোচনার বিষয়।
ব্যাংককের বৈদ্যুতিক বর্জ্যবাহী ট্রাকের পরিকল্পনাটি প্রথম দেখায় খুব স্বাভাবিক একটি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বলেই মনে হতে পারে। শহরের প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডিজেলচালিত ট্রাকের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক ট্রাক আনা হলে জ্বালানি ব্যয় কমবে, শব্দদূষণ ও ক্ষতিকর ধোঁয়া কমবে এবং বায়ুদূষণের অন্যতম সমস্যা পিএম২.৫-এর ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যাংকক গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্টের দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১ হাজার ৩৪৭টি বৈদ্যুতিক বর্জ্যবাহী ট্রাক পাঁচ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন বাতের বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে। একই সময়ে ডিজেলচালিত ট্রাক চালাতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন বাতের জ্বালানি। অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বাত বা ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা দেখানো হয়েছিল। ইজারা ব্যবস্থার মাধ্যমে নগর প্রশাসনের আর্থিক চাপও ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমতে পারে বলে দাবি করা হয়।
তারপরও পরিকল্পনাটি অনুমোদন পায়নি।
আপত্তির জায়গা কোথায়?
ব্যাংকক মহানগর পরিষদের সদস্যদের প্রশ্ন ছিল মূলত প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং দুর্নীতির সম্ভাবনা নিয়ে। একটি বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রকল্পে কারা সরবরাহকারী হবে, কী শর্তে তারা কাজ পাবে এবং শহরটি বাস্তবে বৈদ্যুতিক ট্রাক পরিচালনার জন্য প্রস্তুত কি না—এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর তারা পাননি।
বিরোধী পিপলস পার্টিও একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। ব্যাংককের সংসদ সদস্য সুফানাত মিনচাইয়ানুনের বক্তব্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বৈদ্যুতিক বর্জ্যবাহী ট্রাক প্রকল্পের জন্য ১০ বিলিয়নেরও বেশি বাত বাজেট করা হলেও বিভিন্ন কারণে সেগুলো আটকে গেছে বা বাতিল হয়েছে। এবার প্রায় ৬ বিলিয়ন বাত চাওয়া হলেও প্রকল্পের দরপত্রের শর্ত বা কারিগরি বিবরণ তখনও স্পষ্ট ছিল না।
এখানে পরিষদের সতর্কতা অযৌক্তিক নয়। বড় সরকারি প্রকল্পে কেবল ধারণাটি ভালো হলেই যথেষ্ট নয়; অর্থ কোথায় যাবে, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ করবে, প্রতিযোগিতা কতটা উন্মুক্ত থাকবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তরও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যাটি শুরু হয় যখন একই ধরনের সতর্কতা অন্য প্রকল্পে দেখা যায় না।
এআই প্রকল্পে ভিন্ন গতি
‘টিএইচ-এআই পাসপোর্ট’ প্রকল্পটি জাতীয় পর্যায়ের উদ্যোগ। এর লক্ষ্য লাখ লাখ থাই নাগরিককে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। প্রযুক্তিগত রূপান্তরের এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের যুক্তি স্পষ্ট—বিশ্ব যখন দ্রুত এআইনির্ভর অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের দিকে এগোচ্ছে, তখন থাইল্যান্ড পিছিয়ে থাকতে পারে না।
কিন্তু এই প্রকল্প নিয়েও পিপলস পার্টি প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধী দলের উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসার প্রায় এক বছর আগেই সম্ভাব্য ঠিকাদারদের প্রস্তুত করা হয়েছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রকল্পের কারিগরি শর্তও নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহকারীকে সুবিধা দিতে পারে—এমন অভিযোগ ওঠে। প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন বাতের প্রকল্পটি ঘোষিত উদ্দেশ্য পূরণে যথেষ্ট কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিষয়টি এতটাই গুরুতর মনে হওয়ায় দলটি প্রমাণ জাতীয় দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পাঠিয়ে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
সরকার অবশ্য বলেছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত এআই গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। একপর্যায়ে জানানো হয়, এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রকল্পটিতে নিবন্ধন করেছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে।
একটি প্রকল্পে সম্ভাব্য দুর্নীতি, অবকাঠামো ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ যাচাই প্রয়োজন; অন্যদিকে একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আরেকটি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথে চলে যায়—তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড কী?
সিদ্ধান্তের আগেই কি সিদ্ধান্ত তৈরি হয়?
সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হবেই—এমন কথা বলা হচ্ছে না। বৈদ্যুতিক বর্জ্যবাহী ট্রাকের প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, কিংবা এআই পাসপোর্ট প্রকল্পটি সত্যিই জনস্বার্থে কতটা কার্যকর হবে, তার চূড়ান্ত বিচার সময়ই করবে।
সমস্যা বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিতে।
যখন কোনো সরকার কোনো একটি ফলাফলকে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় বা অপরিহার্য হিসেবে ধরে নেয়, তখন পরবর্তী যাচাই-বাছাই ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তখন প্রশ্ন হয় না—‘এটি করা উচিত কি না?’ বরং প্রশ্ন দাঁড়ায়—‘কীভাবে এটি করা যায়?’
এই পার্থক্যটি গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংককের বর্জ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পর্যালোচনা, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং পরিষদের আপত্তি প্রকল্পটিকে আবার নকশার টেবিলে ফিরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে এআই প্রকল্পে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তাকে দ্রুত বাস্তবায়নের যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই জনস্বার্থের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু যাচাইয়ের মাত্রা একই রকম নয়।
এ ধরনের নির্বাচিত কঠোরতা শুধু একটি প্রকল্পের প্রশ্ন নয়। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি সম্পর্কে বড় একটি প্রশ্ন তৈরি করে।
নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন প্রক্রিয়াটি সত্যিকার অর্থে কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সব দিক যাচাই করার বদলে আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার কাজে পরিণত হয়।
আর তখন আরও বড় প্রশ্ন সামনে আসে—সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইচ্ছার সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত মিলে গেলে সেটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হয়ে যায়?
যদি উত্তর হয়, যথেষ্ট দ্রুত—তাহলে একসময় হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আলাদা করে কোনো বিবেচনা প্রক্রিয়ার প্রয়োজনই থাকবে না।
ভানিচ কিত্তিচাই 


















