মার্কিন মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তার পর এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপটি বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ, গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক হামলা এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের ক্রম নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে বহু মাস ধরে অচলাবস্থা বিরাজ করছিল।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে একটি “ঐতিহাসিক” অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, ইসরায়েল সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই রোডম্যাপ অনুমোদন করেনি। অন্যদিকে হামাস জোর দিয়ে বলেছে, যুদ্ধবিরতির অধীনে ইসরায়েল তার দায়বদ্ধতা পূরণ করলেই কেবল এই চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
নতুন চুক্তিতে কী রয়েছে?
বোর্ড অব পিসের বিবৃতি অনুযায়ী, কয়েক মাসের আলোচনার পর মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এই রোডম্যাপ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে।
বোর্ড অব পিস জানিয়েছে, হামাস “তাদের সব অস্ত্র ত্যাগের একটি বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনায়” সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এর পরবর্তী ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে। এই রোডম্যাপের আওতায় ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) ধীরে ধীরে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাদের সহায়তায় থাকবে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স)। এর মাধ্যমে গাজায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা জোরদার এবং মানবিক পরিস্থিতির উন্নয়নের পথ এগিয়ে নেওয়া হবে।
ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তি “সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পিত বিভিন্ন ধাপে” বাস্তবায়ন করা হবে। নিরস্ত্রীকরণের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন ও যাচাই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে পর্যায়ক্রমে সরে যাবে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গাজার শাসনভার হস্তান্তর করা হবে এনসিএজির কাছে, যা একটি প্রযুক্তিনির্ভর বা টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক সংস্থা। একই সঙ্গে ভারী অস্ত্র, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং সামরিক উৎপাদনকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে সেগুলো কমিটি ও একটি আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার অধীনে আনা হবে। তবে কোনো অস্ত্রই ইসরায়েল বা অন্য কোনো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তর করা হবে না।
রয়টার্স জানিয়েছে, হামাসের একটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে যে ভারী অস্ত্র ভবিষ্যতের একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে; সেগুলো ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়া হবে না।
আল জাজিরা আরও জানায়, একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) নতুনভাবে গঠিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করবে। একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা ধীরে ধীরে গাজা থেকে সরে যাবে। পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষ হতে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ দিন সময় লাগতে পারে।

পুনর্গঠন ও শাসনব্যবস্থা
প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের ফলে গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই নতুন চুক্তিতে গাজার বেসামরিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার জানুয়ারিতে গঠিত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) ঘোষণা করেছে, তারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ইসরায়েলের বাধার কারণে কমিটিটি এখন পর্যন্ত গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি এবং বর্তমানে কায়রো থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এক বিবৃতিতে এনসিএজি জানায়, তারা রোডম্যাপ বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হওয়াকে স্বাগত জানায় এবং একে “গাজা উপত্যকার জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” হিসেবে বর্ণনা করে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “এনসিএজি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।” কমিটি জানায়, জনসেবা পুনরায় চালু করা, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সহজ করা, আইনের শাসন শক্তিশালী করা এবং পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
কমিটি বলেছে, তাদের প্রশাসন পরিচালিত হবে “এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক নিরাপত্তা কাঠামো” নীতির ভিত্তিতে। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, গাজাকে পুনর্গঠন করতে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং ফিলিস্তিনি, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এনসিএজি বোর্ড অব পিস, হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয়, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করবে, মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে, পুনর্গঠনের ভিত্তি স্থাপন করবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় কমিটিটি ভারী অস্ত্র সংরক্ষণের তদারকি করবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গাজার বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করবে।
হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ আল জাজিরাকে বলেন, হামাস “ফিলিস্তিনি জাতীয় কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই থাকবে।”
আল জাজিরা এর আগে হামাসের একটি সূত্রের বরাতে জানায়, রূপান্তরকালীন সময়ে যেসব কর্মচারী চাকরি হারাবেন, তারা ফিলিস্তিনি আইনের আওতায় আইনি সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে এনসিএজি গাজার আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়গুলোর নিরীক্ষা করবে এবং সরবরাহকারী ও ঠিকাদারদের বকেয়া দায়সমূহ পর্যালোচনা করবে।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিসের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেছেন, এই চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “চুক্তিতে কী লেখা আছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এরপর কী ঘটে, সেটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবায়ন ও যাচাই অবশ্যই বাস্তব হতে হবে। নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সেনা প্রত্যাহার এগোতে হবে।”
পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে গাজার জন্য এর অর্থ কী?
২০২৬ সালের জুলাইয়ের এই রোডম্যাপটি মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছে। প্রায় নয় মাস ধরে এই ধাপটি কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল।
মূল যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি বন্দি বিনিময়, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং সংঘাত কমানোর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কিন্তু ইসরায়েল দ্বিতীয় ধাপ শুরু করতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে তারা গাজায় প্রতিদিন বোমা হামলা চালিয়ে যায় এবং উপত্যকার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখলে রাখে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি শত শতবার লঙ্ঘন করে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত আকাশ হামলা, গোলাবর্ষণ, গুলি এবং ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ৭৩০ থেকে ১,৪৫০ বারেরও বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গত ১০ মাসে ইসরায়েলের দৈনিক হামলায় প্রায় ১,৩০০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছে। একই সঙ্গে জীবনরক্ষাকারী খাদ্য ও ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে গাজায় প্রবেশে ইসরায়েল কঠোর বিধিনিষেধ বজায় রেখেছে। এর ফলে গণহত্যামূলক যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হওয়া জনগণের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তবে এই নতুন চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে তা গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের সমাপ্তির সূচনা এবং ২০ লাখেরও বেশি মানুষের জন্য ব্যাপক মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
চুক্তি বাস্তবায়িত হলে রাফাহ, কারম আবু সালেম, বেইত হানুনসহ গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ক্রসিংগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এর ফলে মানবিক সহায়তা, বাণিজ্যিক পণ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পুনর্গঠনের নির্মাণসামগ্রী এবং চিকিৎসার জন্য রোগী সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম বাধাহীনভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা শিগগিরই কায়রোতে বৈঠকে বসবেন। সেখানে রোডম্যাপ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হবে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই মিসর গাজা পুনর্গঠনের জন্য তাদের বিস্তৃত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রস্তুত রয়েছে। এই পরিকল্পনা আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন পেয়েছে।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই গণহত্যামূলক যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল একের পর এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি উপেক্ষা করে সামরিক অভিযান চালিয়ে গেছে, যদিও এ নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর হামলায় অন্তত ৭৩ হাজার ৩৪১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৯ লাখ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘ (ইউএন) এবং বিশ্বব্যাংকের (ডব্লিউবি) যৌথ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে শুধু আবাসন খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট ক্ষতির অর্ধেকেরও বেশি।
বাণিজ্য ও শিল্প খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৬.৩৫ বিলিয়ন ডলার। পরিবহন খাতে ৩.২ বিলিয়ন এবং পানি ও স্যানিটেশন খাতে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ও উত্তর গাজা গভর্নরেট সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ২০১৪ ও ২০২১ সালের যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরসহ মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২২.৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতি ৬.৮ বিলিয়ন ডলার, কর্মসংস্থানে ২.৮ বিলিয়ন, বাণিজ্য ও শিল্পে ২.৫ বিলিয়ন এবং শিক্ষা খাতে ২.৪ বিলিয়ন ডলার।
গাজার পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের জন্য মোট ৭১.৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম আট মাসে ১০.৮ বিলিয়ন, পরবর্তী ১৮ মাসে ১৫.৫ বিলিয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি তিন থেকে পাঁচ বছরের পুনর্গঠনের জন্য ৪৫.১ বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। আবাসন খাতে সর্বোচ্চ ১৬.২ বিলিয়ন ডলার, কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় ১০.৫ বিলিয়ন, স্বাস্থ্য খাতে ১০ বিলিয়ন এবং বাণিজ্য ও শিল্প খাতে ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করতে হবে, যার ব্যয় হবে ১.৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও স্যানিটেশন, টেলিযোগাযোগ এবং সড়কব্যবস্থা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মূল্যায়নে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে গাজার অর্ধেকেরও কম হাসপাতাল এবং মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র আংশিকভাবে চালু রয়েছে। অধিকাংশ স্কুল বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, ইসরায়েলের এই গণহত্যা গাজার মানব উন্নয়নকে প্রায় ৭৭ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে অঞ্চলটির মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) ০.৩৩৯-এ নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তর।
এদিকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এখনও গাজার ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে যাচ্ছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) জানিয়েছে, ৫ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি চরম খাদ্যসংকটের মুখে রয়েছে।
এছাড়া ইউএনআরডব্লিউএ, ইউনিসেফ এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) ধারাবাহিকভাবে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, অতিরিক্ত ভিড়ের আশ্রয়কেন্দ্র, শিশু অপুষ্টি এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধের কথা জানিয়ে আসছে।
হামাসের অবস্থান
শুক্রবার হামাস এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, তারা এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতির চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাবের সঙ্গে “দায়িত্বশীল ও ইতিবাচকভাবে” সম্পৃক্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ইসরায়েলের “হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা এবং হামলা সম্পূর্ণভাবে সমাপ্ত করা” হলো এই চুক্তি বাস্তবায়নের মৌলিক পূর্বশর্ত এবং প্রথম পদক্ষেপ। সংগঠনটি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের সব দায়বদ্ধতা ইসরায়েল পূরণ না করা পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হবে না।
হামাস আরও জানায়, চুক্তির আওতায় ভারী অস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করতে তাদের সম্মতি স্পষ্টভাবে কয়েকটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে—
- গাজায় সব ধরনের সামরিক আগ্রাসনের অবসান;
- গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার;
- প্রাথমিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু;
- ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর গাজায় প্রবেশ ও দায়িত্ব গ্রহণ;
- আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বাহিনীর মোতায়েন;
- দখলদার বাহিনীর গঠিত সশস্ত্র গ্যাং ও মিলিশিয়াদের বিলুপ্তি;
- গাজার পুনর্গঠন;
- ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা;
- স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা; এবং
- নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা।
এর আগে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রোডম্যাপের সামগ্রিক কাঠামো গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তারা স্পষ্ট করে দেন, চুক্তির বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করবে ইসরায়েল তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কি না তার ওপর।
রয়টার্সের উদ্ধৃতিতে হামাসের আলোচক গাজি হামাদ এই চুক্তিকে “কঠিন এবং বেদনাদায়ক” বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “গাজার জনগণকে হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য” হামাসকে কিছু ছাড় দিতে হয়েছে।
হামাদ বলেন, ইসরায়েল যদি ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করে—অর্থাৎ হামলা বন্ধ করে, সেনা প্রত্যাহার করে এবং মানবিক সহায়তার প্রবেশ বাড়ায়—তবেই হামাস পরবর্তী ধাপে এগোবে।
তিনি বলেন, “আমরা মধ্যস্থতাকারীদের কাছে জোর দিয়ে বলেছি যে, ইসরায়েলকে অবশ্যই ২০২৫ সালের অক্টোবরের চুক্তি মেনে চলতে হবে।”
আল জাজিরার বরাতে হামাদ আরও বলেন, অস্ত্রের বিষয়টি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার তদারকিতে ইসরায়েলের কোনো ভূমিকা থাকবে না; বরং এটি পরিচালনা করবে একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটি।
আল জাজিরা আরও জানায়, ইসলামিক জিহাদসহ কয়েকটি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর মতে, চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে বিবেচনা করার আগে এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিষ্পত্তি বাকি রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
শুক্রবার পর্যন্ত ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে এই রোডম্যাপ গ্রহণ করেনি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আবারও বলেছেন, “সেনা প্রত্যাহারের আগে গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে।”
একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “যে কোনো প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে ইসরায়েল হামাসের সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, গাজা থেকে সব অস্ত্র অপসারণ এবং পুরো উপত্যকার পূর্ণ সামরিকমুক্তকরণ দাবি করছে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তা “ইসরায়েলের এসব দাবির যথাযথ সমাধান দেয়নি।”
দ্য গার্ডিয়ানও জানিয়েছে, হামাস আগে নিরস্ত্র হবে, নাকি ইসরায়েল আগে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে—এই প্রশ্নে ইতোমধ্যেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হলো “অভিবাসনকে উৎসাহিত করা এবং হামাসকে ধ্বংস করা।”
বিভিন্ন গণমাধ্যমের উদ্ধৃতিতে ইসরায়েলের চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন প্রস্তাবিত এই চুক্তির “বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা নেই।”
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীকে (আইএসএফ) গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল। তবে সেই অনুমোদনের সঙ্গে “ইসরায়েল-সমর্থক” হওয়ার একটি শর্তও যুক্ত করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















