মানববিহীন নৌযানকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে শত্রুভাবাপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রসীমায় সক্রিয় রাখতে সমুদ্রে রোবটের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। সফল হলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নাবিকদের ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেই দূরবর্তী এলাকায় নৌ-ড্রোনের কার্যক্রম বাড়ানো সম্ভব হবে।
সমুদ্রে রোবটের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সম্প্রতি সমুদ্রে মানববিহীন নৌযানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই একটি নৌ-ড্রোন জ্বালানি সংগ্রহ করে আবার নিজের অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে।
ভার্জিনিয়ার উপকূলীয় সমুদ্রসীমায় অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় দূরনিয়ন্ত্রিত টি-৩৮ মানববিহীন নৌযান এবং সমুদ্রে টেনে নেওয়া যায় এমন একটি রোবটচালিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষার সময় নৌযান ও জ্বালানি সরবরাহকারী ব্যবস্থার মধ্যে কয়েক ডজনবার সংযোগ স্থাপন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুশীলন করা হয়।
পরীক্ষায় নৌ-ড্রোনটিতে প্রায় ৪০০ গ্যালন জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।
দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র পরীক্ষায় বাড়বে নজরদারি
এই প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে দীর্ঘপাল্লার ও অতিদ্রুতগতির অস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্রে। এসব অস্ত্রের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন অনেক সময় নির্ধারিত পরীক্ষাক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহকারী বিভিন্ন নৌযান মোতায়েনের প্রয়োজন হয়।
মানববিহীন নৌযান এ ধরনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেগুলোকে বন্দরে ফিরে আসতে হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাদের অবস্থানের সময় কমে যায় এবং পুরো অভিযানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিবার জ্বালানি নেওয়ার জন্য কোনো মানববিহীন নৌযানকে বন্দরে ফিরতে হলে ওই এলাকায় নজরদারির সময়, বিস্তৃতি এবং বিকল্প ব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়।
মানুষের বদলে মানববিহীন নৌযান
সমুদ্রে রোবটের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ সফল হলে শুধু অস্ত্র পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক অভিযানের আরও বিস্তৃত পরিসরে এর ব্যবহার হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বড় ও ব্যয়বহুল যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পরিবর্তে ছোট মানববিহীন নৌযান পাঠানো সম্ভব হবে। এসব নৌযান দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য সামরিক কাজে নিয়োজিত থাকতে পারবে।
এর ফলে শত্রুর আক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় নাবিক ও অন্যান্য সামরিক সদস্যদের সরাসরি পাঠানোর প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম ব্যয়ে একটি বিস্তৃত এলাকায় বেশি সংখ্যক সামরিক সক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়
তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষাটি এখনো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ছিল না। পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হয়েছে।
নৌবাহিনীর পরবর্তী লক্ষ্য হলো পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বয়ংক্রিয় করা। অর্থাৎ নৌ-ড্রোন নিজে থেকেই রোবটচালিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাছে যাবে, সেটির সঙ্গে সঠিকভাবে সংযুক্ত হবে, জ্বালানি নেবে, আবার বিচ্ছিন্ন হবে এবং এরপর কোনো মানুষের ধাপে ধাপে নির্দেশনা ছাড়াই নিজের নির্ধারিত অভিযানে ফিরে যাবে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নৌযানের চলাচল আরও নিখুঁত করা এবং স্থানীয় অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি উন্নত করা প্রয়োজন হবে।
যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে পারে প্রযুক্তি
সমুদ্রে স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হলে মানববিহীন নৌযানের কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। বর্তমানে যেখানে জ্বালানি নেওয়ার জন্য নৌ-ড্রোনকে বারবার নিরাপদ এলাকায় ফিরতে হয়, ভবিষ্যতে সমুদ্রেই রোবটের সহায়তায় জ্বালানি নিয়ে সেগুলো দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করতে পারবে।
এতে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রসীমায় মানুষের উপস্থিতি কমিয়ে মানববিহীন সামরিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পথ আরও প্রশস্ত হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















