উনিশ শতকের অন্যতম স্বতন্ত্র শিল্পী জেমস ম্যাকনিল হুইসলার পৃথিবীকে দেখতেন অন্য সবার চেয়ে আলাদা চোখে। পর্যটকদের ভিড় এড়িয়ে তিনি খুঁজে নিতেন এমন সব স্থান, মানুষ ও মুহূর্ত, যেগুলো সাধারণত অন্যদের নজর এড়িয়ে যেত। তাঁর সেই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিই এবার তুলে ধরা হয়েছে টেট ব্রিটেনের এক বড় প্রদর্শনীতে, যেখানে দেড় শতাধিক শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।
পরিচিত শহর, অচেনা দৃশ্য
১৮৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া হুইসলার জীবনের বড় একটি সময় ইউরোপে কাটিয়েছেন। ভেনিসে গিয়ে তিনি সেন্ট মার্কস স্কয়ার, রিয়ালতো সেতু কিংবা অন্যান্য জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানকে এড়িয়ে সরু গলির ভিখারি, জনসমক্ষে কাপড় সেলাই করা নারী কিংবা নিঃসঙ্গ গন্ডোলাচালকের মতো সাধারণ দৃশ্যকে শিল্পের বিষয় করেছেন।
লন্ডনে বসবাসের সময়ও তাঁর দৃষ্টি আটকে থাকত কুয়াশা ও ধোঁয়াশায়। ভবন ও সেতুর চেয়ে কুয়াশার মধ্য দিয়ে সেগুলোর আবছা উপস্থিতিই তাঁকে বেশি আকৃষ্ট করত। তাঁর বিখ্যাত চিত্র ‘রাতের দৃশ্য: নীল ও সোনালি—পুরনো ব্যাটারসি সেতু’তে সেতুর নিচে ভেলায় বসে থাকা এক নতজানু মানুষকে প্রায় অতিলৌকিক অবয়বের মতো দেখা যায়।
এমন দৃষ্টিভঙ্গির শুরু অবশ্য আরও আগে। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে শৈশব কাটানোর সময়ও হুইসলার পেন্সিলে নিজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিকৃতি আঁকতেন এবং বরফের ওপর হকি খেলতে থাকা ছেলেদের ছবি তুলে ধরতেন।
প্রকৃতিই ছিল শিল্পের সূচনা
শহুরে জীবন তাঁকে গভীরভাবে টানলেও হুইসলারের শিল্পের বিষয় ছিল আরও বিস্তৃত। সমুদ্র, সৈকত, মাঠ, সূর্যাস্ত—প্রকৃতির নানা রূপও তাঁর শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
টেট ব্রিটেনের ব্রিটিশ শিল্প বিভাগের কিউরেটর ক্যারল জ্যাকোবি লিখেছেন, হুইসলারের প্রতিটি শিল্পকর্মের সূচনা ছিল প্রকৃতি থেকে, তা যতই বিমূর্ত হয়ে উঠুক না কেন।
অল্প কয়েকটি রেখা ও সীমিত উপকরণ ব্যবহার করেও কোনো স্থানের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। ১৮৮১ সালে এক ফরাসি শিল্পসমালোচক ভেনিসের তাঁর কিছু দৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, এত কম উপকরণ ও এত সামান্য দৃশ্যমান প্রচেষ্টায় এত বেশি কিছু প্রকাশ করার চেষ্টা আগে খুব কমই দেখা গেছে। কয়েকটি অনুভূমিক রেখায় পানি, আর কিছু আঁকাবাঁকা রেখায় তীর, শহর ও স্থাপনার ইঙ্গিত দিয়েই হুইসলার ভেনিসের সেই পরিচিত অনুভূতিকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।
ছবিতে ধরা পড়ত জায়গার আত্মা
হুইসলারের প্রায় যেকোনো শিল্পকর্ম দেখলেই সেই স্থান বা মানুষের একটি স্বতন্ত্র অনুভূতি পাওয়া যায়। শহরের দৃশ্য, প্রতিকৃতি, ঘরের অভ্যন্তর, কিংবা আলজেরিয়ার রাস্তায় মানুষের জীবন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর শিল্পে জায়গাটির নিজস্ব চরিত্র ফুটে উঠেছে।
লন্ডনের শ্রমজীবী মানুষের নদীতীরবর্তী এলাকার দৃশ্য নিয়ে আঁকা ‘ওয়্যাপিং’ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আবার ‘ধূসর ও কালোর বিন্যাস: শিল্পীর মায়ের প্রতিকৃতি’ তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত শিল্পকর্মগুলোর একটি।
ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বিতর্কিত
শিল্পী হিসেবে হুইসলার ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান, কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে সহজ মানুষ বলা যায় না। শিল্প-ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন তর্কপ্রবণ, আত্মগর্বী, উদ্ধত ও অধৈর্য স্বভাবের।
তবে তাঁর মধ্যে রসবোধও ছিল। নিজের পরিচয় নিয়েও তিনি কখনো কখনো ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা করতেন। জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে তাঁর জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। এক স্মৃতিকথায় তিনি রসিকতার সঙ্গে লিখেছিলেন, প্রথম কথা হলো, তিনি ইংরেজ নন।
কেন তিনি ইউরোপে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে জন্মেছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর নামে একটি রসিক উত্তর প্রচলিত ছিল, তিনি নাকি বলেছিলেন, “আমি আমার মায়ের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছিলাম।”
জীবনের শেষদিকে অসুস্থ অবস্থায় যখন বুঝতে পারছিলেন, দীর্ঘদিন এড়িয়ে আসার পর হয়তো তাঁকে আবার আমেরিকায় ফিরতে হবে, তখনও তাঁর রসবোধ হারায়নি। তিনি লিখেছিলেন, “একটি মহাদেশকে অনন্তকাল হতাশ করা যায় না।”
হুইসলারের চোখে পৃথিবী
হুইসলারের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দেখার ক্ষমতা। যেখানে অন্যরা কেবল একটি সেতু, একটি সৈকত, একটি কুয়াশাচ্ছন্ন শহর কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন দেখতেন, তিনি সেখানে খুঁজে পেতেন আলো, আবহ, নীরবতা ও অনুভূতির নিজস্ব ভাষা।
টেট ব্রিটেনের নতুন প্রদর্শনীটি সেই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামনে এনেছে। তাঁর শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অসাধারণ শিল্পের বিষয় সবসময় অসাধারণ কিছু হতে হয় না—একজন শিল্পীর চোখই সাধারণ দৃশ্যকে অসাধারণ করে তুলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















