০৮:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নেপালের বন্যাবিধ্বস্ত উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই নেই ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ নয়, প্রকৃত তথ্য জানাল পুলিশ সাভারে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু মিশেল কোগান: মিশেলিন তারকা পাওয়া রাঁধুনি, যাঁর পাই এখন নিউইয়র্কে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সন্তান দেখাশোনায় আত্মীয়কেই কাজে নিলেন মা, মিলছে সাহায্য ও পারিবারিক বন্ধন সুপ্রিম কোর্টের বড় রায়: আইন শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই বার কাউন্সিলের ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি খোলা যাবে না লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি রইল কামরান শেখের পদত্যাগ পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ১৫ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, টিটিপি নিয়ে কাবুলকে আবারও চাপ ইসলামাবাদের ইরান যুদ্ধে ফের বাড়ছে বেসামরিক মৃত্যুর শঙ্কা, বিয়ের অনুষ্ঠানে নিহত ৪

হামি মেলনের নেপথ্যে যে গল্প: মরুভূমির মাটি থেকে সিল্ক রোড পেরিয়ে আধুনিক শিল্পনগর

চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হামি মেলন। রসালো, মিষ্টি ও কোমল শাঁসের এই ফল শুধু কৃষিপণ্য নয়, হামি শহরের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হামি মেলনের বিশেষ স্বাদের পেছনে রয়েছে পূর্ব তিয়ানশান পর্বতমালা, শুষ্ক গোবি মরুভূমি, তীব্র সূর্যালোক ও দিন-রাতের তাপমাত্রার বড় পার্থক্য।

যে ভূপ্রকৃতি মেলনকে দিয়েছে আলাদা স্বাদ

হামির মধ্যভাগ দিয়ে চলে গেছে পূর্ব তিয়ানশান পর্বতমালা। এই পর্বতমালা অঞ্চলটিকে দুটি ভিন্ন জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিতে ভাগ করেছে। দক্ষিণে বিস্তৃত গোবি মরুভূমিতে বৃষ্টিপাত কম হলেও সূর্যের আলো প্রচুর। দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য মেলনে চিনির পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করে। অন্যদিকে উত্তরের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকায় তিয়ানশানের বরফগলা পানি বন, তৃণভূমি ও জলাভূমিকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই বৈচিত্র্যের কারণে হামিকে বলা হয় ‘জিনজিয়াংয়ের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ’। এখানে গোবি, তৃণভূমি, তুষারঢাকা পাহাড়, ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় এবং প্রাচীন স্থাপনার পাশাপাশি রয়েছে নানা পর্যটন সম্ভাবনা। দাহাইদাও অঞ্চলের ইয়ারডাং ভূপ্রকৃতি, বারকোল তৃণভূমি এবং ইভু কাউন্টির নাওমাও হ্রদের প্রাচীন পপলার বন তারই উদাহরণ।

মেলন থেকে পর্যটনের নতুন ব্র্যান্ড

হামি এখন কৃষি ও পর্যটনকে একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে। ‘There is a sweetness called Hami’—এই শহর ব্র্যান্ডকে কেন্দ্র করে ফল সংগ্রহ, লোকজ সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা, গোবি অঞ্চলে স্বচালিত ভ্রমণ এবং তৃণভূমিতে অবকাশযাপনের মতো আয়োজন গড়ে উঠছে। ২০২৬-৩০ সময়ে দাহাইদাও মোটরসাইকেল ক্রস-কান্ট্রি র‍্যালিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং জিনজিয়াংয়ের পূর্ব প্রবেশদ্বার হিসেবে সাংস্কৃতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার লক্ষ্যও রয়েছে।

প্রাচীন সিল্ক রোড থেকে আধুনিক বাণিজ্য

হামি বহু শতাব্দী ধরে পূর্ব ও পশ্চিমের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাচীন সিল্ক রোডে কাফেলা, দূত ও সৈন্যদের যাতায়াতের পথে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিরতি ও সরবরাহকেন্দ্র। কিং রাজবংশের সময়ে রাজদরবারে হামির মেলন পাঠানোর ঘটনাও সেই সময়কার দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন ও সংগঠিত যোগাযোগব্যবস্থার পরিচয় বহন করে।

বর্তমানে হামিতে ৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। কৃষি, পশুপালন, বাণিজ্য ও অন্যান্য জীবনধারায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সংযোগ দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালে শহরটি জাতীয় পর্যায়ের জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতির প্রদর্শনী শহরের স্বীকৃতি পায় এবং ২০২৫ সালেও সেই স্বীকৃতি পুনরায় অর্জন করে।

মেলনের সঙ্গে এগোচ্ছে জ্বালানি ও প্রযুক্তি

হামির আধুনিক রূপান্তরের আরেকটি বড় ভিত্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি। জিনজিয়াংয়ের মোট বায়ুসম্পদসমৃদ্ধ এলাকার ৬৬.৩ শতাংশ হামিতে। অঞ্চলটি চীনের অন্যতম বেশি সূর্যালোকপ্রাপ্ত এলাকাও। এরই ভিত্তিতে সেখানে ১০ গিগাওয়াটের জাতীয় পর্যায়ের বায়ুশক্তি ঘাঁটি এবং মিলিয়ন-কিলোওয়াটের ফোটোভোলটাইক ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। শহরটির মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৫১.৭৭ গিগাওয়াট, যার ৭৪.৫ শতাংশই নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

এই জ্বালানি সুবিধা কম্পিউটিং পাওয়ার ও হাইড্রোজেন জ্বালানির মতো নতুন শিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে লানঝৌ-জিনজিয়াং উচ্চগতির রেল, G30 ও G7 মহাসড়ক এবং লাওইমিয়াও স্থলবন্দর হামিকে আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

চার ঘণ্টায় ক্ষেত থেকে রপ্তানি

২০২৬ সালের রপ্তানি মৌসুমে হামির মেলন উৎপাদন ও পরিবহনে গতি আরও বেড়েছে। ক্ষেত থেকে সংগ্রহের পর বাক্সবন্দি করে ট্রাকে তোলার পুরো প্রক্রিয়ায় চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। তাপ ও আঘাতে মেলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে তাজা কৃষিপণ্যের জন্য ২৪ ঘণ্টার গ্রিন চ্যানেল, নির্ধারিত পরিদর্শন এবং অনলাইন সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। জুনের শেষ দিকে মৌসুমের শীর্ষ সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর মাত্র ১০ দিনের কিছু বেশি সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১,৩০০ টন হামি মেলন পাঠানো হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২ গুণ।

গোবির সূর্য, প্রাচীন সিল্ক রোডের স্মৃতি এবং আধুনিক রেল-সড়ক-জ্বালানি ও প্রযুক্তি অবকাঠামো—সব মিলিয়ে হামি মেলন এখন শুধু একটি ফলের নাম নয়। এটি হামির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত এক বিস্তৃত পরিচয়ের প্রতীক।

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালের বন্যাবিধ্বস্ত উপত্যকায় ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই নেই

হামি মেলনের নেপথ্যে যে গল্প: মরুভূমির মাটি থেকে সিল্ক রোড পেরিয়ে আধুনিক শিল্পনগর

০৭:৫৮:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হামি মেলন। রসালো, মিষ্টি ও কোমল শাঁসের এই ফল শুধু কৃষিপণ্য নয়, হামি শহরের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আধুনিক অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হামি মেলনের বিশেষ স্বাদের পেছনে রয়েছে পূর্ব তিয়ানশান পর্বতমালা, শুষ্ক গোবি মরুভূমি, তীব্র সূর্যালোক ও দিন-রাতের তাপমাত্রার বড় পার্থক্য।

যে ভূপ্রকৃতি মেলনকে দিয়েছে আলাদা স্বাদ

হামির মধ্যভাগ দিয়ে চলে গেছে পূর্ব তিয়ানশান পর্বতমালা। এই পর্বতমালা অঞ্চলটিকে দুটি ভিন্ন জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিতে ভাগ করেছে। দক্ষিণে বিস্তৃত গোবি মরুভূমিতে বৃষ্টিপাত কম হলেও সূর্যের আলো প্রচুর। দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য মেলনে চিনির পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করে। অন্যদিকে উত্তরের অপেক্ষাকৃত শীতল এলাকায় তিয়ানশানের বরফগলা পানি বন, তৃণভূমি ও জলাভূমিকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই বৈচিত্র্যের কারণে হামিকে বলা হয় ‘জিনজিয়াংয়ের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ’। এখানে গোবি, তৃণভূমি, তুষারঢাকা পাহাড়, ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় এবং প্রাচীন স্থাপনার পাশাপাশি রয়েছে নানা পর্যটন সম্ভাবনা। দাহাইদাও অঞ্চলের ইয়ারডাং ভূপ্রকৃতি, বারকোল তৃণভূমি এবং ইভু কাউন্টির নাওমাও হ্রদের প্রাচীন পপলার বন তারই উদাহরণ।

মেলন থেকে পর্যটনের নতুন ব্র্যান্ড

হামি এখন কৃষি ও পর্যটনকে একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে। ‘There is a sweetness called Hami’—এই শহর ব্র্যান্ডকে কেন্দ্র করে ফল সংগ্রহ, লোকজ সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা, গোবি অঞ্চলে স্বচালিত ভ্রমণ এবং তৃণভূমিতে অবকাশযাপনের মতো আয়োজন গড়ে উঠছে। ২০২৬-৩০ সময়ে দাহাইদাও মোটরসাইকেল ক্রস-কান্ট্রি র‍্যালিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং জিনজিয়াংয়ের পূর্ব প্রবেশদ্বার হিসেবে সাংস্কৃতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার লক্ষ্যও রয়েছে।

প্রাচীন সিল্ক রোড থেকে আধুনিক বাণিজ্য

হামি বহু শতাব্দী ধরে পূর্ব ও পশ্চিমের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাচীন সিল্ক রোডে কাফেলা, দূত ও সৈন্যদের যাতায়াতের পথে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিরতি ও সরবরাহকেন্দ্র। কিং রাজবংশের সময়ে রাজদরবারে হামির মেলন পাঠানোর ঘটনাও সেই সময়কার দীর্ঘ দূরত্বের পরিবহন ও সংগঠিত যোগাযোগব্যবস্থার পরিচয় বহন করে।

বর্তমানে হামিতে ৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। কৃষি, পশুপালন, বাণিজ্য ও অন্যান্য জীবনধারায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার পারস্পরিক সংযোগ দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালে শহরটি জাতীয় পর্যায়ের জাতিগত ঐক্য ও অগ্রগতির প্রদর্শনী শহরের স্বীকৃতি পায় এবং ২০২৫ সালেও সেই স্বীকৃতি পুনরায় অর্জন করে।

মেলনের সঙ্গে এগোচ্ছে জ্বালানি ও প্রযুক্তি

হামির আধুনিক রূপান্তরের আরেকটি বড় ভিত্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানি। জিনজিয়াংয়ের মোট বায়ুসম্পদসমৃদ্ধ এলাকার ৬৬.৩ শতাংশ হামিতে। অঞ্চলটি চীনের অন্যতম বেশি সূর্যালোকপ্রাপ্ত এলাকাও। এরই ভিত্তিতে সেখানে ১০ গিগাওয়াটের জাতীয় পর্যায়ের বায়ুশক্তি ঘাঁটি এবং মিলিয়ন-কিলোওয়াটের ফোটোভোলটাইক ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। শহরটির মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৫১.৭৭ গিগাওয়াট, যার ৭৪.৫ শতাংশই নবায়নযোগ্য জ্বালানি।

এই জ্বালানি সুবিধা কম্পিউটিং পাওয়ার ও হাইড্রোজেন জ্বালানির মতো নতুন শিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে লানঝৌ-জিনজিয়াং উচ্চগতির রেল, G30 ও G7 মহাসড়ক এবং লাওইমিয়াও স্থলবন্দর হামিকে আধুনিক পরিবহন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

চার ঘণ্টায় ক্ষেত থেকে রপ্তানি

২০২৬ সালের রপ্তানি মৌসুমে হামির মেলন উৎপাদন ও পরিবহনে গতি আরও বেড়েছে। ক্ষেত থেকে সংগ্রহের পর বাক্সবন্দি করে ট্রাকে তোলার পুরো প্রক্রিয়ায় চার ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। তাপ ও আঘাতে মেলন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে তাজা কৃষিপণ্যের জন্য ২৪ ঘণ্টার গ্রিন চ্যানেল, নির্ধারিত পরিদর্শন এবং অনলাইন সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। জুনের শেষ দিকে মৌসুমের শীর্ষ সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর মাত্র ১০ দিনের কিছু বেশি সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১,৩০০ টন হামি মেলন পাঠানো হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.২ গুণ।

গোবির সূর্য, প্রাচীন সিল্ক রোডের স্মৃতি এবং আধুনিক রেল-সড়ক-জ্বালানি ও প্রযুক্তি অবকাঠামো—সব মিলিয়ে হামি মেলন এখন শুধু একটি ফলের নাম নয়। এটি হামির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত এক বিস্তৃত পরিচয়ের প্রতীক।