ইরান যুদ্ধে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন করে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় দেশজুড়ে ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭ জন।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা
স্ট্রেইট অব হরমুজের কাছাকাছি এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট। সংগঠনটি প্রকাশিত ভিডিওতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের পাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ এবং ভবনের ছাদে বড় ধরনের গর্ত দেখা গেছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার পাশে একটি বিদ্যুতের টাওয়ারও পড়ে থাকতে দেখা যায়।
রয়টার্স স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে ঘটনাস্থলের অবস্থান যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, পড়ে যাওয়া টাওয়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে ১৩৬ মিটার দূরে ছিল।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে আসা এসব প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত। তাঁর দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনী বেসামরিক মানুষকে কখনো লক্ষ্যবস্তু করে না।
জাতিসংঘের উদ্বেগ
বেসামরিক হতাহতের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তাঁর মুখপাত্র স্টেফান দুজারিক জানিয়েছেন, বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবরসহ বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় মহাসচিব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
গুতেরেস অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, হামলার মাত্রা বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
আবারও ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত
জুলাইয়ের সংঘাতের পর কিছুটা নীরবতা থাকলেও শান্তি আলোচনা আর এগোয়নি। সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরেও কুয়েতে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা প্রতিহত করেছে।
ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বড় হলেও দেশটি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এবং এর প্রভাবে জ্বালানির দামও বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন।
বেসামরিক প্রাণহানির পুরোনো ক্ষতও সামনে
সাম্প্রতিক বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিন ওই মেয়েদের স্কুলে হামলায় ১৬০ জন নিহত হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পেন্টাগন এখনো ওই ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পুরোনো টার্গেটিং তথ্য ব্যবহারের কারণে হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে মোট ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক। সাম্প্রতিক ১৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা সেই হিসাবের বাইরে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















