ভারতের অর্থনীতি চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী এই প্রবৃদ্ধির পর দেশটির সরকারি জিডিপি হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক আমলা, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ও কয়েকজন অর্থনীতিবিদ সরকারি পরিসংখ্যানের পদ্ধতি এবং মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের হিসাব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে সরকার বলছে, নতুন পদ্ধতিতে প্রকাশিত জিডিপি তথ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম মেনেই তৈরি হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ বেড়েছে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল ৭.১ শতাংশ। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন খাতের শক্তিশালী অবস্থান এবং ভোক্তা চাহিদা এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে আপত্তি
সাবেক অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র গর্গের দাবি, তুলনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আগের বছরের জিডিপির মূল্য কমিয়ে দেখানোর ফলে এবারের প্রবৃদ্ধি বাস্তবের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে।
ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর রঘুরাম রাজনও প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, জিডিপির এত শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হলে কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ এবং বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগে তার আরও দৃশ্যমান প্রভাব থাকার কথা।
জিডিপির প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নির্ধারণে ব্যবহৃত ‘ডিফ্লেটর’ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই সূচকের মাধ্যমে নামমাত্র জিডিপি থেকে মূল্যস্ফীতির প্রভাব বাদ দিয়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়। কিছু বেসরকারি অর্থনীতিবিদের প্রশ্ন, সরকারি হিসাবের ডিফ্লেটর অন্যান্য মূল্যসূচকের তুলনায় মূল্যস্ফীতিকে কম দেখিয়েছে কি না।
সরকারের ব্যাখ্যা
সমালোচনার জবাব দিতে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে জিডিপি হিসাবের পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতেই করা হয়েছে।
নতুন সিরিজে ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুনের নামমাত্র জিডিপি ৮০ লাখ কোটি রুপি ধরা হয়েছে, যেখানে পুরোনো সিরিজে তা ছিল ৮৬.০৫ লাখ কোটি রুপি। সরকার বলছে, দুই সিরিজের সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়, কারণ নতুন পদ্ধতিতে শুধু ভিত্তিবছর নয়, তথ্যের উৎস এবং অন্তর্ভুক্ত পণ্য ও সেবার হিসাবও পরিবর্তন করা হয়েছে।
মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও সরকার নতুন পদ্ধতির কথা জানিয়েছে। এপ্রিল-জুনে ব্যবহৃত ডিফ্লেটর ছিল ২.৩ শতাংশ, যেখানে খুচরা মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের বেশি এবং পাইকারি মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। সরকারের দাবি, নতুন জিডিপি সিরিজে ‘ডাবল ডিফ্লেশন’ পদ্ধতি এবং ৩০০টির বেশি ইনপুট ও আউটপুট ডিফ্লেটর ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যান্য সূচকে কী বলছে অর্থনীতি?
জিডিপির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কিছু উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি অর্থনৈতিক সূচকেরও মিল রয়েছে। আগস্টে গাড়ি বিক্রি ২১ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এপ্রিল-আগস্ট সময়ে ভারতের নিট প্রত্যক্ষ কর আদায়ও এক বছর আগের তুলনায় ২৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
তবে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্সে (পিএমআই), যা জরিপভিত্তিক অর্থনৈতিক সূচক। এটি কয়েক বছরের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও ডিফ্লেটর নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজ প্রাইমারি ডিলারশিপের মতে, ডিফ্লেটর কম হওয়া এমন একটি পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে উৎপাদন খরচের চাপ পণ্যের বিক্রয়মূল্যের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে সোসিয়েতে জেনারেলের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কম ডিফ্লেটর প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















