নিউইয়র্কের ব্যস্ত খাবারের দুনিয়ায় নিজের হাতে তৈরি পাই দিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রাঁধুনি মিশেল কোগান। একসময় শহরের নামী রেস্তোরাঁয় কাজ করে মিশেলিন তারকা অর্জন করা এই রাঁধুনি এখন কোনো ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে নয়, বরং ছোট্ট বাজারের তাঁবুর নিচে দাঁড়িয়ে নিজ হাতে পাই বিক্রি করছেন।
গ্রীষ্মজুড়ে প্রতি সপ্তাহান্তে তাঁকে কখনো ব্রুকলিনের ক্যারল গার্ডেনস, আবার কখনো কুইন্সের সানিসাইডের খোলা বাজারে দেখা গেছে। সেখানেই নিজের প্রতিষ্ঠান ‘মিশিজ সানিসাইড’-এর তৈরি নানা ধরনের পাই নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি।
নামী রেস্তোরাঁ থেকে নিজের পথে
কোগানের রান্নার অভিজ্ঞতা বেশ সমৃদ্ধ। তিনি নোবু, মরিমোতো, টরিসি ও টাও ডাউনটাউনের মতো বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। ২০১২ সালে টরিসিতে কাজ করার সময় তাঁর দল মিশেলিন তারকাও অর্জন করে।
তবে এত সাফল্যের পরও নিজের কিছু করার ইচ্ছা কখনো হারাননি কোগান। দীর্ঘদিনের কঠিন ও চাপপূর্ণ রেস্তোরাঁজীবনে ক্লান্ত হয়ে প্রায় দুই বছর আগে তিনি নিজের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
আবার ফিরে যান শৈশবের সেই জায়গায়, যেখানে রান্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসার শুরু।
দাদির হাতের রান্না থেকেই অনুপ্রেরণা
ব্রুকলিন ও কুইন্সে রুশ ও ইউক্রেনীয় অভিবাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা কোগানের শৈশবের অনেক স্মৃতিই খাবারকে ঘিরে। জন্মদিনে তাঁর দাদি অসাধারণ সব কেক তৈরি করতেন। দাদির রান্না দেখেই কোগানের মনে তৈরি হয় নতুন কিছু বানানোর আগ্রহ।
২০০৫ সালে তিনি ফরাসি রন্ধনশিল্প ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে পেশাদার রান্নাঘরে নিজের জায়গা তৈরি করেন। প্রথমদিকে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ করার পর তিনি মিষ্টান্ন তৈরির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দেন।
তাঁর ভাষায়, নিজের ভালোবাসার জায়গায় ফিরে গিয়ে আবার বেকিং শুরু করার পর ধীরে ধীরে তিনি মানসিক শান্তিও ফিরে পান।
এক পাইয়ের রেসিপি তৈরিতে এক দশক
কোগানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পাইগুলোর একটি লেবুর পাই। এই বিশেষ পাইয়ের রেসিপি নিখুঁত করতে তাঁর লেগেছে প্রায় এক দশক।
প্রতিটি পাইয়ের ভিত্তি হিসেবে তিনি কুকিজের মতো খাস্তা স্তর ব্যবহার করেন। লেবুর পাইয়ে সাধারণত ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের ছোট লেবুর পরিবর্তে তিনি মেক্সিকো থেকে আনা সাধারণ লেবু ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, এতে টক স্বাদ আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য হয়।
তবে তাঁর সাফল্য শুধু একটি পাইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। লেবু-ব্লুবেরি মেরিঙ্গ, তিরামিসু, কলা-বানফি এবং আম-প্যাশনফ্রুট-নারকেল মেরিঙ্গ—এমন নানা স্বাদের পাইও তৈরি করছেন তিনি।
উপকরণের মানেই বেশি দাম
কোগানের পাইয়ের দাম সাধারণ বাজারের পাইয়ের তুলনায় যথেষ্ট বেশি। প্রতিটির দাম প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ ডলার পর্যন্ত।
এর কারণ হিসেবে তিনি ব্যবহার করা উপকরণের উৎস ও মানকে গুরুত্ব দেন। মেইনের ব্লুবেরি, কলম্বিয়ার আম ও প্যাশনফ্রুটসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বেছে বেছে উপকরণ সংগ্রহ করেন তিনি।
তাঁর লক্ষ্য শুধু দেখতে সুন্দর পাই তৈরি করা নয়, প্রতিটি উপকরণের স্বাভাবিক স্বাদও যেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা, সপ্তাহে ৮০০ পাই
কোগানের ভাগ্য বদলে যায় একজন প্রভাবশালী খাদ্যবিষয়ক ব্যক্তিত্ব তাঁর পাই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর। এরপর তাঁর ব্যবসায় হঠাৎ করেই ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়।
কোগানের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০০টি পাই তৈরি করতে হচ্ছে তাঁকে। অনেক সময় দুপুর হওয়ার আগেই বাজারের সব পাই বিক্রি হয়ে যায়।
চাহিদা সামলাতে নিজের বাসাকেও বদলে ফেলতে হয়েছে তাঁকে। বসার ঘর ও দ্বিতীয় শয়নকক্ষের জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন রান্না ও সংরক্ষণের জন্য। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে এখন রয়েছে আটটি ফ্রিজ।
এবার নিজের দোকান
বাজারের ছোট্ট তাঁবু থেকে এবার স্থায়ী দোকানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কোগান। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কুইন্সের সানিসাইডে ‘মিশিজ সানিসাইড’-এর নিজস্ব দোকান চালু করার কথা রয়েছে।
দোকানটির অবস্থান তাঁর কাছে বিশেষ আবেগেরও। একই এলাকায় তাঁর দাদা-দাদির অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ছিল। তাঁর নিজের বাসাও কাছেই। ফলে জায়গাটিকে তিনি নিজের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঠিকানা হিসেবে দেখেন।
নতুন দোকানে শুধু পাই নয়, নানা ধরনের আইসক্রিমও থাকবে। কলা-স্প্লিট, মাল্টেড মিল্কশেক ও হট ফাজ সানডের মতো পুরোনো দিনের জনপ্রিয় মিষ্টান্নকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
সাফল্যের নতুন সংজ্ঞা
একসময় নিউইয়র্কের বিখ্যাত রান্নাঘরে কাজ করে মিশেলিন তারকা অর্জন করেছিলেন কোগান। এখন তিনি একাই নিজের ছোট্ট ব্যবসার প্রায় সবকিছু সামলাচ্ছেন।
তাঁর কাছে সাফল্যের অর্থও বদলে গেছে। বড় রেস্তোরাঁ, পুরস্কার বা খ্যাতির চেয়ে মানুষের জীবনে আনন্দ তৈরি করাকেই এখন তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
খাবার মানুষের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে, আনন্দ দিতে পারে এবং বিশেষ মুহূর্তকে আরও স্মরণীয় করে তুলতে পারে—এই বিশ্বাস থেকেই নিজের পাই তৈরি করছেন কোগান। আর সেই ছোট্ট স্বপ্নই এখন নিউইয়র্কের সবচেয়ে আলোচিত পাইয়ের গল্পে পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















