চীন ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তবে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশের সামনে স্থায়ী ও বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতের জন্য যেমন অনন্ত সংঘাতের পথে থাকা কোনো লাভজনক কৌশল নয়, তেমনি চীনের জন্যও আরেকটি অমীমাংসিত ও দীর্ঘস্থায়ী সীমান্তকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা বাড়ানো স্বস্তিদায়ক নয়।
সংঘাতের বদলে স্থিতিশীলতার প্রয়োজন
চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা বহুদিনের। সীমান্তে উত্তেজনা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে দুই দেশই উপলব্ধি করতে পারে যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা।
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা স্থায়ী বৈরিতায় পরিণত না হয়। প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে, তবে তার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বেইজিংয়ের জন্যও স্থিতিশীল ভারত গুরুত্বপূর্ণ
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল ভারত সুবিধাজনক। ভারতকে যদি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে চীনের সামনে আরও একটি জটিল কৌশলগত চাপ তৈরি হবে।
তাই দুই দেশের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক প্রয়োজন, যেখানে মতবিরোধ থাকলেও তা সরাসরি সংঘাতে রূপ নেবে না। সীমান্তে উত্তেজনা কমানো, নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানো সেই পথ তৈরি করতে পারে।
এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতা
চীন-ভারত সম্পর্ক শুধু দুই দেশের বিষয় নয়। এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ভারত বিভিন্ন আঞ্চলিক জোট ও অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কোনো একটি শক্তিকে কেন্দ্র করে তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্যও সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
ভারতের প্রয়োজন এমন একটি স্বাধীন কৌশল, যেখানে নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চীনসহ সব বড় শক্তির সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক পরিচালনা করা যায়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, তবে সংঘাত অনিবার্য নয়
চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা একেবারে শেষ হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই।
তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই স্থায়ী শত্রুতা নয়। দুই দেশ চাইলে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যেখানে মতবিরোধ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে এবং সহযোগিতার জায়গাগুলো ধীরে ধীরে বিস্তৃত হবে।
বিশেষ করে সীমান্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, সামরিক বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে
চীন ও ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো সম্পর্ককে শূন্য-সম প্রতিযোগিতার বাইরে নিয়ে যাওয়া। কে বেশি শক্তিশালী হবে—এই প্রশ্নের পাশাপাশি দুই দেশ যদি কীভাবে পাশাপাশি অবস্থান করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়, সেই প্রশ্নকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
ভারতের জন্য স্থায়ী সংঘাত এড়িয়ে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। চীনের জন্যও ভারতের সঙ্গে পূর্বানুমানযোগ্য সম্পর্ক বজায় রাখা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে প্রয়োজনীয়।
শেষ পর্যন্ত দুই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং মতবিরোধের মধ্যেও সহাবস্থানের জায়গা কতটা তৈরি করতে পারে তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















