সুপারশপের সবজি বিভাগে দাঁড়ালে আজকের খাদ্যব্যবস্থার একটি বড় বাস্তবতা চোখে পড়ে। প্লাস্টিকে মোড়ানো ব্রোকলি, কাটা ফলের স্বচ্ছ পাত্র, একই রকম দেখতে আপেল, শক্ত লেবু কিংবা স্বাদহীন পিচ—সবকিছুই যেন খাবারের প্রকৃত উৎস থেকে অনেক দূরে। একটি শিশু এসব দেখে সহজেই ভাবতে পারে, খাবার বুঝি এমনই প্যাকেটজাত অবস্থায় জন্মায়। অথচ মাটি, বীজ, পানি, কৃষক ও প্রকৃতির সঙ্গে খাবারের যে গভীর সম্পর্ক, তা এই দৃশ্যের কোথাও নেই।
এই বিচ্ছিন্নতাই বদলাতে চান আলেহান্দ্রো ভেলেজ ও নিখিল অরোরা। তাঁদের লক্ষ্য শুধু পরিবারকে ঘরে খাবার ফলানো শেখানো নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে খাবার কোথা থেকে আসে এবং মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ—তা নতুন করে অনুভব করানো।
কফির উচ্ছিষ্ট থেকে শুরু
ভেলেজ ও অরোরার পরিচয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির একটি ব্যবসায়িক নৈতিকতা বিষয়ক শ্রেণিকক্ষে। সেখানে একদিন তাঁরা জানতে পারেন, কফি তৈরির পর পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট দিয়ে সুস্বাদু মাশরুম চাষ করা যায়।
কৌতূহল থেকেই শুরু হয় পরীক্ষা। অল্প সময়ের মধ্যেই ভেলেজের ছাত্রাবাসের রান্নাঘরে জমতে থাকে কফির উচ্ছিষ্টভর্তি বালতি, আর সেখান থেকে বের হতে থাকে মাশরুমের কুঁড়ি।
এই ছোট্ট পরীক্ষা তাঁদের সামনে খুলে দেয় বড় এক সম্ভাবনা। দুজনেই উপলব্ধি করেন, খাবারের উৎস সম্পর্কে মানুষের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। শেষ পর্যন্ত তাঁরা করপোরেট চাকরি ছেড়ে শহুরে জৈব বাগানচর্চার পথে পা বাড়ান।
তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য শুরু থেকেই একই—পরিবারকে খাবার ও খাবারের উৎসের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা, মানুষকে নিজের খাবার নিজে ফলানোর ক্ষমতা দেওয়া এবং জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও গভীর করা।
ছাত্রাবাসের রান্নাঘর থেকে ঘরে ঘরে বাগান
প্রথমে তাঁরা বাজারে আনেন মাশরুম চাষের কিট। এরপর জানালার পাশে গাছ লাগানোর পাত্র, পানিতে গাছ育ানোর ব্যবস্থা এবং নানা ধরনের বীজের কিট তৈরি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল খুব সহজ—শিশু ও পরিবার যেন নিজেদের ঘরেই খাবার ফলানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে।
তবে ভেলেজ ও অরোরার পরিকল্পনা ঘরের জানালার ধারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁরা বাইরের বাগানচর্চার দিকেও মনোযোগ দেন। বড় একটি খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে তাঁরা জৈব বাগানের জন্য মাটি, উঁচু বেড ও বীজসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে শুরু করেন।
ভেলেজের ভাষায়, প্রতিটি বাড়ি ও শ্রেণিকক্ষে একটি করে বাগান পৌঁছে দেওয়া এবং সেই বাগানকে জৈব পদ্ধতিতে গড়ে তোলাই তাঁদের বড় লক্ষ্য। একটি দোকানে একটি পণ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা পরিণত হয়েছে অভিন্ন মূল্যবোধ ও আস্থার ওপর দাঁড়ানো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে।
শ্রেণিকক্ষেও ফিরছে বাগান
শুধু ঘরে শিশুদের বাগানচর্চার সুযোগ করে দিয়েই থেমে থাকেননি তাঁরা। স্কুলের জন্য তৈরি করেছেন বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক একটি শিক্ষাক্রম, যেখানে বাগানচর্চা ও খাবার সম্পর্কে শেখার সুযোগ রয়েছে।
অরোরা মনে করেন, একটি শিশুকে তার খাবারের উৎসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা খুব কমই আছে। তাঁর মতে, স্কুলের অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের মতো বাগানচর্চা ও পুষ্টিশিক্ষাকেও শিশুদের শিক্ষার অংশ করা উচিত।
শিশুদের জন্য তাঁদের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে বীজ উপহার কর্মসূচির মাধ্যমে। কোনো শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বাগানের ছবি প্রকাশ করলে প্রতিষ্ঠানটি তার পছন্দের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে একটি বাগান করার কিট ও শিক্ষাক্রম দান করে। অর্থাৎ একটি শিশুর বাগানচর্চা থেকে আরেকটি শ্রেণিকক্ষও একই অভিজ্ঞতার সুযোগ পায়।
কঠিন পথেও অটুট বিশ্বাস
নতুন কোনো উদ্যোগ গড়ে তোলার পথ কখনোই সহজ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে নানা বাধা, অনিশ্চয়তা ও অপ্রত্যাশিত সমস্যার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাঁদের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও বিশ্বাস বরং আরও বেড়েছে।
ভেলেজ ও অরোরার দীর্ঘ যাত্রার অন্যতম শক্তি তাঁদের পারস্পরিক অংশীদারত্ব। তাঁরা শুধু একই লক্ষ্যকে ধারণ করেন না, একসঙ্গে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পান।
অরোরার বিশ্বাস, বাগানচর্চার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও আনন্দ তৈরি করার মতো উদ্যোগ আজকের সময়ে বিশেষ প্রয়োজনীয়। বিভাজন, নেতিবাচকতা ও সামাজিক দূরত্বের সময়ে খাবার ফলানো, একসঙ্গে রান্না করা এবং একই টেবিলে বসে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মতো সহজ ও প্রাচীন সামাজিক কর্মকাণ্ড মানুষকে আবারও কাছাকাছি আনতে পারে।
তাঁদের কাছে বাগান তাই শুধু কয়েকটি গাছের সমষ্টি নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা, প্রকৃতি, খাবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সংযোগ ফিরিয়ে আনার একটি উপায়। আর সেই ছোট্ট বাগান থেকেই হয়তো গড়ে উঠতে পারে এমন এক প্রজন্ম, যারা খাবারকে শুধু বাজারের পণ্য হিসেবে নয়, মাটি ও মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফল হিসেবে দেখতে শিখবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















