ভারতের পাঞ্জাবে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট সামান্য কমার লক্ষণ দেখা গেলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নতুন এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, রাজ্যটিতে প্রতিবছর ভূগর্ভে যত পরিমাণ পানি পুনরায় জমা হয়, তার তুলনায় উত্তোলন করা হচ্ছে অনেক বেশি।
সাম্প্রতিক ভূগর্ভস্থ পানি সম্পদ মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাঞ্জাবে প্রতিবছর প্রায় ১৯ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি ভূগর্ভে পুনর্ভরণ হয়। এর মধ্যে প্রতিবছর নিরাপদভাবে উত্তোলনের উপযোগী পানির পরিমাণ প্রায় ১৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ঘনমিটার। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালে রাজ্যটিতে ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ২৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি।
অর্থাৎ, প্রতিবছর নিরাপদভাবে উত্তোলনযোগ্য পানির তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি পানি তুলে নেওয়া হচ্ছে। রাজ্যটির মোট ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের মাত্রা দাঁড়িয়েছে ১৫২ দশমিক ২২ শতাংশে।
কৃষিই পানির ওপর সবচেয়ে বড় চাপ
পাঞ্জাবের ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কৃষি সেচ। ২০২৫-২৬ সালে মোট উত্তোলিত ২৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানির মধ্যে ২৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ঘনমিটারই ব্যবহার হয়েছে সেচের কাজে।
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে কৃষিজমিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে নলকূপনির্ভর সেচব্যবস্থা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে।
১১০টি অঞ্চল অতিরিক্ত উত্তোলনের ঝুঁকিতে
পাঞ্জাবে ভূগর্ভস্থ পানির ১৫৩টি মূল্যায়ন অঞ্চলকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১০টি অঞ্চলকে অতিরিক্ত উত্তোলনকারী, ৬টি অঞ্চলকে সংকটাপন্ন, ১৭টি অঞ্চলকে আধা-সংকটাপন্ন এবং মাত্র ২০টি অঞ্চলকে নিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ১৫৩টি অঞ্চলের মধ্যে ১১৬টিই অতিরিক্ত উত্তোলনকারী অথবা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। রাজ্যের প্রায় ৭২ শতাংশ মূল্যায়ন অঞ্চল এখনো সংকটজনক অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
তবে গত দুই বছরে অতিরিক্ত উত্তোলনকারী অঞ্চলের সংখ্যা ১১৫ থেকে কমে ১১০-এ নেমেছে। আরও ৯৫টি অঞ্চলে আগের তুলনায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের গতি কমেছে। ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
খালনির্ভর সেচে সমাধানের চেষ্টা
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পাঞ্জাব সরকার খালনির্ভর সেচব্যবস্থা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। কৃষকদের জমিতে খালের পানি পৌঁছে দেওয়া গেলে সেচের জন্য নলকূপের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
যেসব এলাকায় খালের পানির প্রাপ্যতা বেড়েছে, সেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাপ কমার কিছু প্রমাণও পাওয়া গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজ্য সরকার খালভিত্তিক সেচ সম্প্রসারণ এবং খালের শেষ প্রান্তের কৃষকদের কাছেও পানি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমার কারণে আগে অতিরিক্ত উত্তোলনকারী হিসেবে চিহ্নিত পাঁচটি অঞ্চল এখন সংকটাপন্ন শ্রেণিতে এসেছে। এটি বিকল্প সেচব্যবস্থা চালু করলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব—এমন একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।
তবে অতিরিক্ত উত্তোলনকারী শ্রেণি থেকে সংকটাপন্ন শ্রেণিতে চলে আসা মানেই সংকটের অবসান নয়। সংকটাপন্ন শ্রেণিতেও ভূগর্ভস্থ পানির পরিস্থিতি গুরুতর থাকে।
শুধু খাল সম্প্রসারণে মিলবে না স্থায়ী সমাধান
পাঞ্জাবে খালনির্ভর সেচ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ, পানির অতিরিক্ত ব্যবহার মূলত কৃষিক্ষেত্রেই হচ্ছে।
মোট ২৬ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের মধ্যে প্রায় ২৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ঘনমিটারই সেচে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কৃষিতে পানির চাহিদা কমানো এবং সেচব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলা করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খালের পানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফসলের ধরন পরিবর্তন, কম পানি প্রয়োজন এমন ফসলের চাষ বাড়ানো, সেচের পানির অপচয় কমানো এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
পাঞ্জাবের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ভূগর্ভস্থ পানিকে শুধু বিকল্প উৎস হিসেবে নয়, সীমিত ও মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। নইলে উত্তোলন ও পুনর্ভরণের মধ্যে বর্তমান বিশাল ব্যবধান ভবিষ্যতে আরও গভীর পানিসংকট তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















