চীনে হিউম্যানয়েড রোবট বা মানবাকৃতির রোবট নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাস এখন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে দেশটির নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যায়ন, সরকারি সহায়তানির্ভর আয় এবং প্রকৃত বাণিজ্যিক চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর এই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে প্রবেশ বা আইপিওর অনুমোদন কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত কয়েকজনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের নিয়ন্ত্রকেরা হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা কোম্পানিগুলোর আইপিওর গতি কমিয়ে দিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। বরং বিভিন্ন বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে নতুন নির্দেশনা বা ‘উইন্ডো গাইডেন্স’ দিয়ে অনুমোদনের মানদণ্ড কঠোর করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউনিট্রি রোবোটিকসের শেয়ারের অস্থিরতা। হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি গত আগস্টে সাংহাইয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেই এর শেয়ারের দাম পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ দামের তুলনায় শেয়ারটির মূল্য প্রায় ৫৫ শতাংশ কমে গেছে।
ইউনিট্রির এই অভিজ্ঞতা চীনের হিউম্যানয়েড রোবট খাতকে ঘিরে অতিরিক্ত বিনিয়োগের উন্মাদনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। নিয়ন্ত্রকদের আশঙ্কা, কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন যদি প্রকৃত ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে ক্ষতির ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়তে পারে।
চীনের সরকার অবশ্য হিউম্যানয়েড রোবট থেকে সরে যাচ্ছে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি রূপকে, যা বাস্তব জগতের বস্তু বুঝতে ও তার সঙ্গে কাজ করতে পারে, দেশটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নতুন শিল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রযুক্তিকে চীনে ‘এমবডিড ইন্টেলিজেন্স’ বা বাস্তব জগতে কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের এই অগ্রাধিকারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় সরকারগুলোও রোবট খাতে বিপুল অর্থ ঢালছে। এর ফলে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে একের পর এক নতুন কোম্পানি তৈরি হচ্ছে, পুরোনো শিল্প রোবট নির্মাতারাও হিউম্যানয়েড রোবটের দিকে ঝুঁকছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

কিয়ানচুয়াং ক্যাপিটালের ভেঞ্চার পুঁজিবিদ লিও ওয়াং এই পরিস্থিতিকে ‘অভিযানধর্মী উদ্ভাবন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, চীনে যখন কোনো একটি খাত সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার পায়, তখন সেখানে কোম্পানি ও মূলধনের প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বেড়ে যায়।
ওয়াংয়ের দাবি, এমবডিড এআই ঘিরে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা চীনের আগের ইন্টারনেট ও নতুন জ্বালানি খাতের বিনিয়োগ-উন্মাদনার চেয়েও বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠাতা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কয়েক ডজন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর আগ্রহ পাচ্ছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবসায়িক যাচাই-বাছাই বা ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে বেসরকারি বাজারে কিছু রোবট কোম্পানির মূল্যায়ন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে তিনি জানান।
আসল আয় কোথা থেকে আসছে?
হিউম্যানয়েড রোবট কোম্পানিগুলোর আয়ের উৎস নিয়েই এখন নিয়ন্ত্রকদের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন।
চীনের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার-সমর্থিত প্রকল্প থেকে রোবট কোম্পানিগুলো যে আয় করছে, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রোবট প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি তথ্য সংগ্রহকেন্দ্র এবং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পগুলো নিয়েই বেশি নজরদারি চলছে।
কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার এসব যৌথ উদ্যোগের প্রাথমিক বিনিয়োগের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বহন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের অর্ডার পাচ্ছে, যা তাদের বেসরকারি বাজারের মূল্যায়ন বাড়াতে এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক মানদণ্ড পূরণ করতে সহায়তা করছে।
কিন্তু এখানেই নিয়ন্ত্রকদের প্রশ্ন—এসব প্রকল্প কি প্রকৃত বাজার চাহিদার প্রতিফলন, নাকি সরকারি সহায়তার কারণে তৈরি হওয়া কৃত্রিম চাহিদা?
একজন রোবট বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেছেন, তথ্য সংগ্রহকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত আয় বাদ দিলে কিছু রোবট কোম্পানির মূল্যায়ন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ কোম্পানিগুলোর আয়ের পরিমাণ যতটা বড় দেখাচ্ছে, তার সবটাই যে স্বাধীন ও টেকসই বাণিজ্যিক চাহিদা থেকে আসছে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

আইপিওর দৌড়ে একাধিক কোম্পানি
চীনে অন্তত ছয়টি হিউম্যানয়েড রোবট কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিপ রোবোটিকস, এক্স স্কয়ার রোবট এবং এজিবট।
তবে নিয়ন্ত্রকদের সাম্প্রতিক অবস্থানের কারণে এসব কোম্পানির আইপিও পরিকল্পনা আগের মতো দ্রুত এগোবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রোবট খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান মেক-মাইন্ড রোবোটিকসের প্রধান নির্বাহী শাও তিয়ানলান চলতি মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে অভিযোগ করেছেন, উচ্চ মূল্যায়ন পাওয়া কিছু এমবডিড-এআই কোম্পানি আইপিওর দৌড়ে এগিয়ে যেতে তথ্য সংগ্রহকেন্দ্র, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন এবং অন্যান্য অস্থিতিশীল ব্যবস্থার মাধ্যমে আয় তৈরি করছে।
তিনি পরে নিজের ওই বক্তব্য নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মেক-মাইন্ড রোবোটিকসের শেয়ারও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
উন্মাদনা থেকে বাস্তবতার পরীক্ষায়
তবে চীনের নিয়ন্ত্রকদের এই সতর্ক অবস্থানকে হিউম্যানয়েড রোবট খাত থেকে সরকারের পিছু হটার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
বরং বিনিয়োগকারী ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, চীন এখন এই খাতের প্রযুক্তিগত প্রদর্শনীর বদলে বাস্তব ব্যবহার, অর্ডারের পরিমাণ এবং নিয়মিত বাণিজ্যিক আয়ের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক রুইয়িং ঝাও বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব এখন ‘সবার প্রতি উচ্ছ্বাস’ থেকে ‘বাছাই করে বাস্তবতা যাচাই’-এর দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোম্পানির মূল্যায়ন কতটা বেশি হতে পারে, তার চেয়ে সেই মূল্যায়নের পেছনে বাস্তব ব্যবসায়িক সাফল্য কতটা আছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চীনের মূল ভূখণ্ডের কোম্পানিগুলোর অর্থ সংগ্রহ অবশ্য সামগ্রিকভাবে আবার বাড়ছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত চীনা কোম্পানিগুলো শেয়ার বিক্রি ও রূপান্তরযোগ্য বন্ডের মাধ্যমে ১৪৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ ৫৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অংশ ৪১ শতাংশ।
অর্থাৎ বিনিয়োগের অর্থ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে রোবট কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা এখন অনেক বেশি হিসাব-নিকাশ করে এগোচ্ছেন।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে নতুন শেয়ার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত এক জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার বলেন, রোবট কোম্পানিগুলো এখনো বিনিয়োগ পাচ্ছে। তবে বিনিয়োগকারীরা জানতে চাইছেন—রোবটগুলো বাস্তবে কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কত সংখ্যায় বিক্রি বা মোতায়েন হচ্ছে এবং কোম্পানির বর্তমান মূল্যায়ন সেই ব্যবসার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মূল প্রশ্নটি এখন খুব সরল—রোবট কি শুধু মঞ্চে নাচছে, নাকি সত্যিই কারখানায় কাজ করছে?
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও সরকারি সমর্থন দিয়ে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সাফল্যে রূপ দিতে না পারলে দ্রুত বেড়ে ওঠা মূল্যায়ন টেকসই নাও হতে পারে।
ফলে চীনের রোবট শিল্পে এখন নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে—উন্মাদনার নয়, বাস্তবতার পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















