বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অর্থ, ক্ষমতা এবং রাজনীতির সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—বিশ্বকাপ—নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান উপেক্ষা করা সহজ নয়। বিশ্বকাপের মালিকানার অংশ বিক্রির পরিকল্পনা থেকে ফিফার সরে আসা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তন নয়; এটি ফুটবল শাসনের সীমা, বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে প্রস্তাবটি ফুটবল পরিবারকে একত্রিত করার বদলে বিভক্ত করছে। অথচ মাত্র একদিন আগেও সংস্থাটি এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। এই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন দেখায়, কখনও কখনও সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার চেয়েও রাজনৈতিক বাস্তবতা বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপের মালিকানা নিয়ে বিতর্ক কেন এত গভীর
ফিফার পরিকল্পনার মূল ধারণা ছিল বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মূল্যকে নতুন কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদে পরিণত করা। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ক্রীড়া আসরগুলোর একটি। নতুন বিনিয়োগ এলে আরও আয় হতে পারত—এমন যুক্তিও ছিল।
কিন্তু সমস্যাটি অর্থে নয়, নিয়ন্ত্রণে। ফুটবলের বহু সংগঠন এবং সদস্য দেশের আশঙ্কা ছিল, একবার বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের এই দরজা খুলে গেলে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের চরিত্র বদলে যেতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ধীরে ধীরে ফুটবল নয়, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে।
এই কারণেই বিরোধিতা শুধু একটি নীতিগত আপত্তি ছিল না; এটি ছিল বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে মৌলিক উদ্বেগ।
সম্মিলিত প্রতিরোধই বদলে দিল সমীকরণ
প্রথমে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা আপত্তি জানায়। পরে কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও একই অবস্থানে চলে আসে। এত বড় তিনটি কনফেডারেশনের বিরোধিতার অর্থ ছিল, ফিফার প্রস্তাব ভোটে টিকে থাকার সম্ভাবনাই দ্রুত ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ফিফা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ক্রীড়া সংস্থা হলেও, তার বৈধতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে ২১১টি সদস্য দেশের সম্মতির ওপর। যখন বৃহৎ অংশের সদস্যরা একই প্রশ্নে একজোট হন, তখন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অবস্থান বা প্রশাসনিক ইচ্ছা যথেষ্ট থাকে না।
ফুটবলের রাজনীতিতে এ ঘটনা ভবিষ্যতের জন্যও একটি নজির হয়ে থাকবে।
ইনফান্তিনোর জন্য এটি শুধু নীতিগত পরাজয় নয়
জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দীর্ঘদিন ধরে এমন একজন নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি বিতর্কের মধ্যেও নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন। বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ, নতুন প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ—প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের লক্ষ্য অর্জন করেছেন।
কিন্তু এবার চিত্রটি ভিন্ন।
ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার পদত্যাগ, শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য অসন্তোষ এবং সাবেক নেতৃত্বের সমালোচনা—সব মিলিয়ে এই বিতর্ক তাঁর নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন তিনি আরেকটি মেয়াদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অতীতে তিনি প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এখন সেই নিশ্চয়তা আর নেই। বরং প্রথমবারের মতো শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা দৃশ্যমান হচ্ছে।
)
নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন অধ্যায়
ফিফার আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি শুধু কে প্রেসিডেন্ট হবেন সেই প্রশ্ন নয়; বরং ফিফা কোন দর্শন অনুসরণ করবে, সেটিও নির্ধারণ করবে।
একদিকে রয়েছে আরও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ধারণা। অন্যদিকে রয়েছে সদস্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, যেখানে বিশ্বকাপকে কেবল আয়ের উৎস নয়, বৈশ্বিক ফুটবলের যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়।
সম্ভাব্য নতুন প্রার্থীদের ঘিরে আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বিতর্ক শুধু একটি প্রস্তাব বাতিল করেনি; এটি নেতৃত্বের ভারসাম্যও বদলে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ আপাতত নিরাপদ, কিন্তু বিতর্ক শেষ নয়
স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, বিশ্বকাপ বয়কটের আশঙ্কা আপাতত দূর হয়েছে। নারী ও পুরুষ—দুই বিশ্বকাপই আগের মতো ফিফার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হওয়ার পথেই রয়েছে।
তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান ভাবার সুযোগ নেই।
বিশ্বকাপ আজ এমন এক সম্পদ, যার আর্থিক মূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতেও নতুন বাণিজ্যিক কাঠামো, বিনিয়োগ বা মালিকানার বিকল্প মডেল নিয়ে আলোচনা আবার ফিরে আসতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই আলোচনায় ফুটবলের মৌলিক স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে। বিশ্বকাপকে শুধুমাত্র বাজারের দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। এটি এমন একটি প্রতিযোগিতা, যার মালিকানা কাগজে ফিফার হলেও, এর নৈতিক মালিকানা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থক, খেলোয়াড় এবং সদস্য দেশের সম্মিলিত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হলে সবচেয়ে ক্ষমতাধর সংস্থাকেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয়।
বেন স্টেইনার অবলম্বনে 











