মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় কাতার গোপনে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে দাবি করেছেন একাধিক আঞ্চলিক ও পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাতার চেয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফানকে সম্ভাব্য হামলার বাইরে রাখতে। তবে কাতার এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
গোপন যোগাযোগের দাবি
নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর কাতার তেহরানের কাছে এমন একটি প্রস্তাব পাঠায় যাতে ইরান রাস লাফানে হামলা না চালালে কাতার নিজ উদ্যোগে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রাখবে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হতো এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারত।
একজন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কাতার ইরানকে বোঝাতে চেয়েছিল যে হামলা ছাড়াই তারা নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
কাতারের অস্বীকৃতি
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রশ্নের জবাবে কাতার জানিয়েছে, রাস লাফানে উৎপাদন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কর্মীদের সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে। দেশটির আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দপ্তর বলেছে, ইরানের সঙ্গে কোনো সমন্বয় বা যুদ্ধের গতিপথ প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে জ্বালানি উৎপাদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
কাতারের একজন কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানকে সাধারণভাবে হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল, কিন্তু রাস লাফানের জন্য বিশেষ সুরক্ষা চাওয়া বা জ্বালানি বাজারকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

রাস লাফানের গুরুত্ব
রাস লাফান শুধু কাতারের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস রপ্তানি কেন্দ্র। এখানকার উৎপাদিত গ্যাস এশিয়া ও ইউরোপের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর উৎপাদন স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্বালানির ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
যুদ্ধ, হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি
মার্চের শুরুতে কাতার রাস লাফান কার্যক্রম বন্ধ করে। সে সময় দেশটির কর্মকর্তারা সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকির কথা বললেও পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে বড় ধরনের ক্ষতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের হামলায় স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে কাতার জানায়।
জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি তখন বলেন, হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দেন, ক্ষতি পুরোপুরি মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং এর প্রভাব চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখে। এই দ্বৈত অবস্থান দেশটিকে যুদ্ধের সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে ফেলেছে।
বর্তমান ও সাবেক পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঞ্চলিক অবরোধ, হামাস নেতাদের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের অভিজ্ঞতা কাতারকে আত্মরক্ষামূলক কূটনীতির দিকে আরও বেশি ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে দেশটি বিভিন্ন নেপথ্য যোগাযোগের পথ খুঁজে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন সব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















