বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য কমানো নিয়ে যখন ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, তখন রাশিয়া জানিয়ে দিল—ডলার থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য তাদের নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর যেকোনো পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারে মস্কো প্রস্তুত।
মঙ্গলবার ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল আলাপচারিতায় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রাশিয়ার এই অবস্থান তুলে ধরেন। নয়াদিল্লিতে আসন্ন ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনের ঠিক আগে তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ডলার নিয়ে রাশিয়ার অবস্থান কী
রাশিয়া তথাকথিত ডি-ডলারাইজেশন বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে না বলে জানান পেসকভ। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, কোনো একটি মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাণিজ্যের জন্য বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য পথ খোলা রাখা।
পেসকভের মতে, অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোন মুদ্রা ব্যবহার করা হবে, তা বাণিজ্যিক প্রয়োজন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশ তাদের জাতীয় মুদ্রাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করেননি ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র।
ভারত-রাশিয়া বাণিজ্যে রুপির জটিলতা
রাশিয়া ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো রাশিয়ার কাছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় রুপি জমে থাকা।
দুই দেশের বাণিজ্যে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর ফলে রাশিয়ার হাতে যে অতিরিক্ত রুপি জমেছে, তা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়—আসন্ন বৈঠকে সেই বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
পেসকভ জানিয়েছেন, ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বাণিজ্য জাতীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি জোটটির জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পুতিন-মোদির বৈঠকে বাণিজ্যই বড় বিষয়
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে অংশ নেবেন। সম্মেলনে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, অর্থব্যবস্থা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পুতিনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হবে। দুই নেতার আলোচনায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কীভাবে কমানো যায়, সেটিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
বিরল খনিজ থেকে যুদ্ধবিমান—আলোচনায় একাধিক বিষয়
ভারত ও রাশিয়ার আলোচনায় শুধু মুদ্রা ও বাণিজ্য নয়, বিরল খনিজ অনুসন্ধানে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রযুক্তি ও আধুনিক শিল্পের জন্য বিরল খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় এসব খনিজের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে এই খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনাও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার তৈরি সুখোই সু-৫৭ যুদ্ধবিমান ভারতের কাছে বিক্রির সম্ভাবনাও আলোচনায় আসতে পারে। ফলে আসন্ন বৈঠক দুই দেশের প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিকসের সম্প্রসারণে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক সমীকরণ
ব্রিকস এখন আগের তুলনায় অনেক বড় ও বৈচিত্র্যময় একটি জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি ইথিওপিয়া, মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও বর্তমানে এই জোটের অংশ।
সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিকসের অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। একই সঙ্গে জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পরিশোধব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় সদস্য দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
তবে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—মস্কো এখনই ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নিচ্ছে না। বরং তারা এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রহণযোগ্য মুদ্রা ও পরিশোধ পদ্ধতিও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় এই অবস্থান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক লেনদেনের কাঠামোকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















