২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের আকাশে তখনও সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারের ১০৭ তলায় অবস্থিত ‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’ রেস্তোরাঁয় দিনের কাজ শুরু করছিলেন কর্মীরা। কারও হাতে ছিল আগের রাতের চকোলেট কেকের শেষ টুকরো, কেউ জানালা দিয়ে শহরের ওপর সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়া দেখছিলেন। সকালের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল অনেক কর্মীর প্রতিদিনের প্রিয় রীতি।
‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’ শুধু একটি রেস্তোরাঁ ছিল না। নিউইয়র্কের বাসিন্দা ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের কাছে এটি ছিল জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উদ্যাপনের জায়গা। সেখানে কাজ করাকে অনেকেই স্বপ্নের চাকরি মনে করতেন।
রেস্তোরাঁটির সোমেলিয়ে ও ওয়েটার পাওলো ভিয়েল্লা ব্রাজিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তাঁর বিরল রোগে আক্রান্ত ছেলের চিকিৎসার সুযোগের আশায়। চাকরিটি তাঁর কাছে এতটাই মূল্যবান ছিল যে তিনি বন্ধুদের বলতেন, ‘আমি এই জায়গা কখনো ছাড়ব না।’ তাঁর সহকর্মীদের অনেকে এসেছিলেন বাংলাদেশ, আইভরি কোস্ট, পেরু, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে।
তারপর এল ১১ সেপ্টেম্বর।
সেদিনের হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর ৭৯ জন কর্মী এবং ৯১ জন অতিথিও ছিলেন। ৯/১১-এর ইতিহাসে এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একটি জীবন, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
একটি শহরের অদৃশ্য সম্পর্ক দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল
লেখক টম রস্টন তখন টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন। নিউইয়র্কের বাসিন্দা হিসেবে তাঁর মনে হয়েছিল, এমন একটি দিনে তিনি যেন নিজের শহর থেকে দূরে অবস্থান করছেন।
কিন্তু ৯/১১-এর সবচেয়ে গভীর অভিঘাতগুলোর একটি ছিল—এই হামলা শহরের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে হঠাৎ দৃশ্যমান করে দিয়েছিল।
কারও জানা গেল, তাঁর সন্তানের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষকের এক আত্মীয় ক্যান্টর ফিটজেরাল্ডে কাজ করতেন। কারও প্রতিবেশীর ভাই ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য। কেউ জানতে পারলেন, পরিচিত আরেকজন ওই ভবনে ছিলেন।
স্বাভাবিক সময়ে এসব সম্পর্ক হয়তো মানুষের অজানাই থেকে যেত। কিন্তু ৯/১১-এর পর শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক ও শোক সেই অদৃশ্য সংযোগগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।
নিউইয়র্কের রাস্তায় কয়েক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ মানুষের পোস্টার দেখা যায়। পরিবারের সদস্যদের খোঁজে মরিয়া আবেদনগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয় শোকের প্রতীকে। শহরের বাতাসেও তখন ধোঁয়ার গন্ধ। ধ্বংসস্তূপের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে ছিল একটি কঠিন প্রশ্ন—কেন কেউ সেদিন বেঁচে গেলেন, আর কেউ গেলেন না?
এই আকস্মিকতার অনুভূতিই ৯/১১-এর শোককে আরও গভীর করে তুলেছিল।
শেষ মুহূর্তে বদলে যাওয়া একটি সিদ্ধান্ত
‘উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর প্রধান শেফ মাইকেল লোমোনাকোর গল্পটি সেই অনিশ্চয়তারই একটি উদাহরণ।
সেদিন সকালে তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বেসমেন্টে ছিলেন। কাজে যাওয়ার আগে শেষ মুহূর্তে তিনি চশমা মেরামত করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তের কারণে তিনি লিফটে উঠে রেস্তোরাঁয় পৌঁছাতে পারেননি।
এরপর তিনি মাটি কাঁপতে অনুভব করেন, আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখেন এবং সাউথ টাওয়ারে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ আঘাত হানতে দেখেন। তিনি আরও দেখেছিলেন, ৯১ তলার ওপর আটকে পড়া মানুষ জানালা দিয়ে বড় বড় কাপড় নাড়ছিলেন। সেগুলো সম্ভবত তাঁর রেস্তোরাঁর টেবিলক্লথ ছিল।
২৫ বছর পরও সেই দৃশ্য তাঁর কাছে অস্পষ্ট হয়নি।
লোমোনাকো নিহত কর্মীদের পরিবারের জন্য তহবিল গঠনে সহায়তা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কে আরও কয়েকটি সফল রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন। কিন্তু তাঁর স্মৃতিতে ৯/১১ যেন সময়ের সঙ্গে দূরে সরে যায়নি।
তাঁর ভাষায়, একটি প্রজন্ম এই ঘটনার পর বড় হয়ে উঠেছে, কিন্তু তাঁর কাছে সেটি এখনো যেন গতকালের ঘটনা।

২৫ বছর: কারও কাছে পুরো জীবন, কারও কাছে একটি অধ্যায়
৯/১১-এর ২৫তম বার্ষিকী সময়ের অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
৩০ বছরের কম বয়সী কারও কাছে ২৫ বছর প্রায় একটি অনন্তকাল। ২৫ বছর বয়সী কারও কাছে এটি তাঁর পুরো জীবন। আবার ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের কাছে এটি দীর্ঘ একটি অধ্যায়—কিন্তু পুরো জীবনের সমান নয়।
এই পার্থক্যই ৯/১১-কে প্রজন্মের মধ্যে একটি সীমারেখায় পরিণত করেছে।
আজকের তরুণদের অনেকেই হামলার সময় জন্মই নেয়নি। তারা ৯/১১ সম্পর্কে বইয়ে পড়েছে, শ্রেণিকক্ষে ইতিহাস হিসেবে শিখেছে কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে ঘটনার দৃশ্য দেখেছে। কিন্তু যারা সেদিনের আতঙ্ক, ধোঁয়া, নিখোঁজ মানুষের পোস্টার এবং শহরের শোক নিজেদের চোখে দেখেছেন, তাঁদের কাছে এটি কেবল ইতিহাস নয়।
এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে।
তবু লোমোনাকোর মতে, যারা ৯/১১-এর এই বার্ষিকীতে আবেগ অনুভব করেন, তাঁদের উচিত কোনো না কোনোভাবে ঘটনাটি নিয়ে কথা বলা। কারণ নিহতদের স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁদের মৃত্যুকে স্মরণ করা নয়; তাঁদের জীবনের গুরুত্বও স্বীকার করা।
শোক কি কখনো পুরোপুরি শেষ হয়?
২৫ বছর ধরে লোমোনাকো নিজের শোকের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছেন—অস্বীকার, রাগ, সমঝোতার চেষ্টা, বিষণ্নতা এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা।
তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো, অন্য কারও সঙ্গে শোক ভাগ করে নেওয়ার সময় মানুষ একই সঙ্গে নিজের ক্ষতিকেও অনুভব করে। সেই অভিজ্ঞতাই মানুষের মধ্যে এক ধরনের মানবিক বন্ধন তৈরি করতে পারে।
৯/১১-এর পর নিউইয়র্কে রক্ত দিতে চাওয়া মানুষের দীর্ঘ সারি সেই সম্মিলিত মানবিকতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।
তবে শোককে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ছিল। ‘কখনো ভুলে যেও না’ বলা সহজ, কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকা অনেক কঠিন।
লেখক টম রস্টনের নিজের জীবনেও এই প্রশ্নটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রাউন্ড জিরো পরিষ্কার করা এবং নতুন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার গড়ে ওঠার দীর্ঘ সময় তাঁর কাছে এক ধরনের শূন্যতার মতো মনে হয়েছিল।
সেই শূন্যতার একটি অংশ পূরণ করার জন্য তিনি ২০১৯ সালে ‘দ্য মোস্ট স্পেকটাকুলার রেস্টুরেন্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: দ্য টুইন টাওয়ার্স, উইন্ডোজ অন দ্য ওয়ার্ল্ড, অ্যান্ড দ্য রিবার্থ অব নিউইয়র্ক’ বইটি লেখেন। বইটির কেন্দ্র ছিল রেস্তোরাঁটির ইতিহাস, সেখানে যাঁরা কাজ করতেন এবং যাঁরা সেখানে যেতেন তাঁদের জীবন, এবং ৯/১১-এর মাধ্যমে নিউইয়র্কের যে অংশটি হারিয়ে গিয়েছিল তার স্মৃতি।
পরবর্তীতে বইটি ‘টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রে রূপ নেয়।
অসম্পূর্ণতাও কি জীবনের অংশ?
রস্টন নিজের ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গেও ৯/১১-এর অভিজ্ঞতার একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। ১৯৮০ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর বাবাকে হারান।
পরে উইলিয়াম স্টাইরনের ‘ডার্কনেস ভিজিবল: এ মেমোয়ার অব ম্যাডনেস’ বইয়ে তিনি ‘অসম্পূর্ণ শোক’ ধারণাটির সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁর নিজের লেখা বিভিন্ন বইয়েও হারিয়ে যাওয়া সময়, স্মৃতি এবং ক্ষতির বিষয় ফিরে এসেছে।
এখান থেকেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—শোক কি কখনো পুরোপুরি শেষ হয়?
রাব্বি এলিয়ট কসভগ্রোভের একটি ২০২৩ সালের স্মরণসভায় দেওয়া বক্তব্যে শিশুতোষ লেখক শেল সিলভারস্টেইনের ‘দ্য মিসিং পিস’ বইয়ের উদাহরণ উঠে আসে। গল্পে একটি বৃত্ত তার হারিয়ে যাওয়া অংশ খুঁজতে থাকে। সেটি খুঁজে পাওয়ার পর প্রথমে আনন্দিত হলেও পরে বুঝতে পারে, সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সে আগের মতো ধীরে চলতে পারছে না, পথের পোকামাকড় ও অন্য পথচারীদের সঙ্গে কথা বলতে পারছে না, আগের অভিজ্ঞতাগুলোও আর হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত সে সেই হারানো অংশটি ছেড়ে দেয়।
রাব্বি কসভগ্রোভের বক্তব্যে এর সঙ্গে শোকের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাব্বি হ্যারল্ড কুশনারের ভাষায়, মানুষ কখনো কখনো অসম্পূর্ণতার মধ্যেই আরও পূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে শোক মানে শুধু হারানো মানুষ বা সময়কে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা নয়। বরং সেই অনুপস্থিতিকে জীবনের অংশ হিসেবে বহন করাও শোকের একটি রূপ।

অন্ধকারের মধ্যেও জীবনের মূল্য
ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়—রাব্বি কসভগ্রোভের বক্তব্যের এই ধারণার সঙ্গে লোমোনাকোর অভিজ্ঞতারও মিল রয়েছে।
লোমোনাকো বলেন, ব্যক্তিমানুষের জীবন এবং জীবনের প্রতি তাঁর মূল্যায়ন ৯/১১-এর পর আরও গভীর হয়েছে।
শোকের সঙ্গে বেড়ে ওঠাকে একই সঙ্গে ধারণ করা সহজ নয়। একটি মানুষ একই সময়ে হারানোর বেদনা অনুভব করতে পারেন এবং জীবনকে নতুনভাবে মূল্য দিতে পারেন। এই দুই অনুভূতি পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তবে তারা পাশাপাশি থাকতে পারে।
নিউইয়র্কের ৯/১১ স্মৃতিসৌধ ও তার প্রতিফলন পুকুরগুলো সেই দ্বৈত অনুভূতিরই একটি প্রকাশ। স্থানটি একই সঙ্গে গম্ভীর, নীরব ও শ্রদ্ধাময়; আবার সেখানে প্রতিদিন মানুষের চলাচলও আছে, পর্যটকের ভিড়ও আছে।
প্রতি ১১ সেপ্টেম্বর আকাশে জ্বলে ওঠা ‘ট্রিবিউট ইন লাইট’ও স্মৃতির আরেকটি শক্তিশালী প্রতীক। রাতের আকাশ ভেদ করে উঠে যাওয়া সেই আলোকস্তম্ভগুলো নিহতদের স্মরণ করে, আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
লোমোনাকোর কাছে এটি অনেকটা গির্জায় গিয়ে একটি মোমবাতি জ্বালানোর মতো—শোকের একটি নীরব প্রকাশ। কিন্তু আলো একই সঙ্গে পথও দেখায়।
২৫ বছর পর ৯/১১-এর স্মৃতি তাই শুধু ধ্বংস, মৃত্যু কিংবা শোকের গল্প নয়। এটি হারানো মানুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি বেঁচে থাকা মানুষের জীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সময়ের সঙ্গে ক্ষতকে বহন করার গল্পও।
কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। কিছু স্মৃতি কখনো পুরোপুরি পুরোনো হয় না। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতাকেই সঙ্গে নিয়ে মানুষ সামনে এগিয়ে যায়—আর হয়তো সেখানেই শোকের ভেতর থেকে জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















