মরক্কোর কাসাব্লাংকায় মাত্র তেরো বছর বয়সে মোহাম্মদ লুইজির সঙ্গে যোগাযোগ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিরা। আঠারো বছর বয়সে তিনি এই আন্দোলনের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেন, যার লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা। ফ্রান্সে ছাত্র থাকাকালীন তিনি হয়ে ওঠেন দুটি মসজিদের প্রতিনিধি আর লিল শহরে ফ্রান্সের মুসলিম ছাত্র সংগঠনের প্রধান। তবে ২০০৬ সালে এই আন্দোলনকে সর্বগ্রাসী প্রকল্প মনে হওয়ায় তিনি ব্রাদারহুড ছেড়ে দেন, আর এখন একে ফ্রান্স ও মুসলিমদের জন্য প্রকৃত বিপদ বলে মনে করেন।
ফরাসি কর্তৃপক্ষও উদ্বিগ্ন ব্রাদারহুডের কার্যক্রম নিয়ে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটি সময়ের সঙ্গে ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ও নারী অধিকারের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সুইডেন ও জার্মানিতেও একই ধরনের উদ্বেগ থেকে চলছে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান। তবে ইউরোপের ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী দলগুলো আরও এক ধাপ এগিয়ে, তারা মুসলিম অভিবাসীদেরই সরাসরি ইউরোপীয় সভ্যতার জন্য হুমকি বলে চিহ্নিত করছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। পশ্চিম ইউরোপের প্রতিটি দেশে মুসলিমদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের কম, যদিও তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যার হার ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১ শতাংশে। ২০১৫ সালে সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শরণার্থীদের ঢেউয়ের কারণে এই সংখ্যা বেড়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন আসা মানুষেরা দ্রুত সমাজে মিশে গেছেন, জার্মানির এক গবেষণা বলছে ২০১৫ সালে আসাদের ৬৪ শতাংশ ২০২২ সাল নাগাদ কাজ খুঁজে পেয়েছেন, যা জাতীয় কর্মসংস্থান হারের কাছাকাছি।:format(webp)/s3/static.nrc.nl/wp-content/uploads/2026/09/11125715/120926OPI_2036615705_islam.jpg)
ব্রিটেনে অভিবাসীদের সন্তানরা স্থানীয়দের চেয়ে স্কুলে ভালো ফল করছে। তবে সব জায়গায় একীভূতকরণ সমানভাবে এগোয়নি। সুইডেনের পুলিশ কিছু এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে অপরাধ বা ধর্মীয় উগ্রবাদের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী। তবে এসব এলাকা নো-গো জোন নয়, বরং পুলিশের বাড়তি নজরদারিতেই থাকে। ইউরোপে জিহাদি সন্ত্রাসের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কম, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নে চব্বিশটি চেষ্টার মধ্যে বেশিরভাগই ব্যর্থ হয়েছে, সফল হয়েছে মাত্র নয়টি হামলা, যাতে প্রাণ গেছে পাঁচজনের।
তবে সহিংসতা ছাড়াও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইউরোপের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। জার্মানি একে বলছে আইনসংগত ইসলামপন্থা, যা সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য হুমকি বলে মনে করা হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশটিতে ব্রাদারহুডের সদস্য সংখ্যা চার থেকে দশ হাজারের মধ্যে, যা মোট ৭৫ লাখ মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় খুবই সামান্য। তবে এই সংখ্যা কম হলেও এই প্রবণতা মোকাবিলা সহজ নয়, কারণ রক্ষণশীল ধর্মীয় বিশ্বাস আর গণতন্ত্রবিরোধী তৎপরতার মধ্যে সীমারেখা টানা কঠিন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন উগ্রপন্থী মতবাদ ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যা সমস্যা মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলছে। একই সঙ্গে ডানপন্থী উগ্রবাদীরাও ইসলামভীতি উসকে দিতে সমান সক্রিয়। জার্মানির হামবুর্গের এক কর্মকর্তার ভাষায়, চরম ডানপন্থা আর উগ্রপন্থী ইসলামপন্থীরা আসলে একে অপরের সহযোগী, দুই পক্ষই বিভাজন থেকে লাভবান হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এখনো চলমান, ঠিক যেভাবে আগের কয়েক প্রজন্মের ক্যাথলিক, ইহুদি বা ক্যারিবীয় অভিবাসীরা একসময় ইউরোপীয় সমাজে মিশে গিয়েছিলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















