ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলের তিগ্রাইয়ে চার বছর আগে থেমে যাওয়া যুদ্ধ আবারও বড় আকারে ফিরে এসেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় হওয়া প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ বন্ধ করেছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে তিগ্রাই পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট—টিপিএলএফ—নেতৃত্বাধীন একটি বিদ্রোহী জোট এবং ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নও বলছে, এই সামরিক উত্তেজনা ২০২০–২০২২ সালের সংঘাতের পর প্রতিষ্ঠিত শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতিকে বিপন্ন করছে।
৪ অক্টোবরের সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী তিগ্রাইয়ের রাজধানী মেকেলের আলুলা আবা নেগা বিমানবন্দর পুনর্দখল করেছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। তবে সরকারি বাহিনী ও টিপিএলএফ—কোনো পক্ষই এখনো বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকারে বিধিনিষেধের কারণে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পুরোপুরি যাচাই করাও কঠিন।
অর্থাৎ, তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ থামেনি; বরং ২০২২ সালের শান্তিচুক্তি কার্যত বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন হলো—এই সংঘাত কি ইথিওপিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে ইরিত্রিয়া, লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে?
মেকেলে পুনর্দখল যুদ্ধের শেষ নয়
২৩ সেপ্টেম্বর টিপিএলএফ-সমর্থিত বাহিনী মেকেলের বিমানবন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলের পর সরকারি বাহিনীর সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। তিগ্রাইয়ের বাইরে আফার ও আমহারা অঞ্চলেও লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। পরে সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালিয়ে আলামাতা ও অন্যান্য কৌশলগত এলাকায় অগ্রসর হয়।
টিপিএলএফ নেতা ডেব্রেতসিয়ন গেব্রেমাইকেল সরকারবিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে মেকেলে পুনর্দখল হলেও সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বরং মেকেলে হারালে টিপিএলএফ প্রচলিত সম্মুখযুদ্ধের বদলে গেরিলা কৌশল নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু তিগ্রাইয়ের আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নেই। পশ্চিম তিগ্রাইয়ের বিতর্কিত ভূখণ্ড, টিপিএলএফের নিরস্ত্রীকরণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আঞ্চলিক নেতৃত্বের বিরোধ—সব বিষয় এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।
কেন ইরিত্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ
তিগ্রাইয়ের যুদ্ধকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ইরিত্রিয়া।
ইথিওপিয়া একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। কিন্তু তার উত্তরে রয়েছে ইরিত্রিয়া, যার দীর্ঘ উপকূল লোহিত সাগরের তীরে। ইরিত্রিয়ার আসাব ও মাসাওয়া বন্দর ইথিওপিয়ার জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশের সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার।
ইথিওপিয়া দীর্ঘদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারকে কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদও সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে ইরিত্রিয়া আশঙ্কা করছে, সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের প্রয়োজনের কারণে ইথিওপিয়া তার ভূখণ্ড বা বন্দর নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আসাব বন্দর এই দ্বন্দ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
আর এ কারণেই তিগ্রাইয়ের সাম্প্রতিক সংঘাত শুধু একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সম্পর্ক কেন সংকটজনক
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়েছে। ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন এবং ইথিওপিয়ার ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহযোগিতার অভিযোগ করেছে। ইরিত্রিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার কূটনীতিকদের বহিষ্কার ও দূতাবাস বন্ধ করে দেয়। এরপর ১ অক্টোবর ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ১ অক্টোবর ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ও মিসরকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই তিন দেশের উত্তেজনা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিসরের বিরুদ্ধে টিপিএলএফকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছে। তিন দেশই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে এখনো এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই যে ইরিত্রিয়া সরাসরি তিগ্রাইয়ের যুদ্ধে সামরিকভাবে জড়িয়েছে। কিন্তু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া সংঘাতের আঞ্চলিক ঝুঁকি অবশ্যই বাড়িয়েছে।
তাহলে কি যুদ্ধ লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ছে?
এই মুহূর্তে সরাসরি বলা যাবে না যে তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়েছে।
এখন পর্যন্ত সংঘাতের মূল কেন্দ্র তিগ্রাই ও আশপাশের স্থলভাগ। লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক নৌপথে তিগ্রাই যুদ্ধের সরাসরি সামরিক হামলা বা তেলবাহী জাহাজে আক্রমণের তথ্য নেই।
কিন্তু মূল ঝুঁকিটি অন্যত্র।
ইরিত্রিয়া যদি সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সীমান্তের যুদ্ধ লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথিরা ইতিমধ্যে বাব আল-মান্দাবের কাছে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে হুথিদের ইয়েমেনের মোখা ও লোহিত সাগরের কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর এসেছে। ফলে লোহিত সাগরের দুই প্রান্তেই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই দুই সংকট সরাসরি একই সংঘাতের অংশ নয়। কিন্তু একই সামুদ্রিক করিডরকে প্রভাবিত করতে পারে।
তেলের জন্য কেন বাব আল-মান্দাব এত গুরুত্বপূর্ণ
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল। এর দক্ষিণে ইয়েমেন, পশ্চিমে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া। এই পথ দিয়ে জাহাজ লোহিত সাগর পেরিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের দিকে যেতে পারে।
এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাবে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাব আল-মান্দাব দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, ঘনীভূত তরল ও পরিশোধিত পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল ও ঘনীভূত তরলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন।
অর্থাৎ, এই একটি সরু জলপথে প্রতিদিন বিশ্ববাজারের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি চলাচল করে।
তাই সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু জাহাজের নিরাপত্তা নয়, তেল সরবরাহের সময়, পরিবহন ব্যয়, বীমা ব্যয় এবং বাজারে ঝুঁকির মূল্য—সবই বেড়ে যেতে পারে।
তিগ্রাই যুদ্ধ তেলের দামে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে
তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ সরাসরি তেল উৎপাদনকারী দেশকে প্রভাবিত করছে না। তাই সংঘাতের প্রথম ধাক্কায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ হঠাৎ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
কিন্তু বাজার শুধু সরবরাহের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; ঝুঁকিও দামের অংশ।
যদি তিগ্রাইয়ের সংঘাত ইরিত্রিয়াকে সরাসরি টেনে নেয় এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হয়, তাহলে জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো বাব আল-মান্দাব এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে কেপ অব গুড হোপ দিয়ে চলাচল করতে পারে। ২০২৩ সালের হুথি হামলার পর এমন রুট পরিবর্তন ইতিমধ্যেই দেখা গেছে। দীর্ঘ রুটে জাহাজের যাত্রার সময়, জ্বালানি ও ভাড়া বেড়ে যায়।
এর প্রভাব কয়েক ধাপে বাজারে পড়তে পারে—
প্রথমত, পরিবহন ব্যয় বাড়বে।
দীর্ঘ রুটে বেশি জ্বালানি ও সময় প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধঝুঁকি বীমার প্রিমিয়াম বাড়বে।
সেপ্টেম্বরেই লোহিত সাগরের উত্তেজনার কারণে সৌদি আরবের রেড সি টার্মিনালমুখী ট্যাংকারগুলোর যুদ্ধঝুঁকি বীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তৃতীয়ত, সরবরাহে বিলম্ব হবে।
একটি ট্যাংকারের যাত্রা কয়েক সপ্তাহ দীর্ঘ হলে নির্দিষ্ট বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ-সংকট তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, তেলের দামে ঝুঁকি-প্রিমিয়াম যুক্ত হবে।
সরবরাহের পরিমাণ একই থাকলেও ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বাধার আশঙ্কায় বেশি দাম দিতে পারেন।
বাজার ইতিমধ্যে কতটা সংবেদনশীল
বর্তমান বৈশ্বিক তেলবাজার এমনিতেই অস্থির। সেপ্টেম্বরের শেষ দিনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ৫০ ডলারে উঠেছিল এবং সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ও পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ ছিল এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
Reuters-এর সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তেলের বাজারে এখন ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবহনপথের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামে বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, কোথায় তেল রয়েছে এবং সেটি নিরাপদে বাজারে পৌঁছাতে পারবে কি না—দাম নির্ধারণে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় তিগ্রাইয়ের সংঘাত যদি লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বাজারের প্রতিক্রিয়া সামরিক সংঘাতের তুলনায় দ্রুত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: দুটি সংকটের মিলন
এখানেই তিগ্রাই সংঘাতের বড় ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।
একদিকে রয়েছে—
- তিগ্রাইয়ে টিপিএলএফ ও কেন্দ্রীয় সরকারের যুদ্ধ;
- ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন;
- ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের কৌশলগত আগ্রহ;
- ইরিত্রিয়ার আসাব ও মাসাওয়া বন্দরকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ;
- সুদানে চলমান যুদ্ধ;
- মিসর–ইথিওপিয়ার নীলনদ ও বাঁধসংক্রান্ত বিরোধ।
অন্যদিকে রয়েছে—
- ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি;
- বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা সংকট;
- লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি;
- তেল পরিবহনের বাড়তি বীমা ও ভাড়া;
- সুয়েজ খাল ও কেপ অব গুড হোপ—দুটি বিকল্প রুটের ওপর বাড়তি চাপ।
রয়টার্সের -এর আঞ্চলিক বিশ্লেষণও বলছে, তিগ্রাইয়ের নতুন সংঘাত, ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার বিরোধ, সুদানের যুদ্ধ এবং লোহিত সাগরের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী
বাংলাদেশ তেল উৎপাদনকারী দেশ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব মূলত আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ ও শিল্পের জ্বালানি খরচ এবং শেষ পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের ওপর পড়তে পারে।
লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালভিত্তিক বাণিজ্যপথে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা হলে এশিয়া–ইউরোপ বাণিজ্যে চলাচলকারী জাহাজগুলোর রুট পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে জাহাজভাড়া ও যাত্রার সময় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। লোহিত সাগরের সংকট ইতিমধ্যেই জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ানোর উদাহরণ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাই শুধু অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম নয়; জ্বালানি আমদানির মোট সরবরাহ-শৃঙ্খল ব্যয়।
সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ
প্রথম দৃশ্যপট—তিগ্রাইয়ে সংঘাত সীমাবদ্ধ থাকে।
ইথিওপিয়ার সরকারি বাহিনী সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং ইরিত্রিয়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালে লোহিত সাগরের তেল পরিবহনে তিগ্রাই যুদ্ধের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।
দ্বিতীয় দৃশ্যপট—ইরিত্রিয়া সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
সে ক্ষেত্রে ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সীমান্ত ও লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়বে। জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি-প্রিমিয়াম বাড়তে পারে।
তৃতীয় ও সবচেয়ে জটিল দৃশ্যপট—হর্ন অব আফ্রিকা ও ইয়েমেনের সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই ক্ষেত্রে বাব আল-মান্দাবের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তেলবাহী জাহাজগুলো বিকল্প রুটে যেতে বাধ্য হলে পরিবহন সময় ও ব্যয় বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামে নতুন ঝুঁকি-প্রিমিয়াম যুক্ত হতে পারে।
তিগ্রাইয়ের যুদ্ধ এখনো মূলত ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্থলসংঘাত। এটিকে ইতিমধ্যে লোহিত সাগরের যুদ্ধ বলা সঠিক হবে না। কিন্তু ইথিওপিয়া–ইরিত্রিয়া সম্পর্কের দ্রুত অবনতি এবং ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা সংঘাতটির ভূরাজনৈতিক পরিধি বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লোহিত সাগর এখন এমনিতেই উচ্চঝুঁকির একটি বাণিজ্যপথ। বাব আল-মান্দাব দিয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিদিন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য চলাচল করেছে। ফলে তিগ্রাই সংঘাত যদি ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং একই সময়ে ইয়েমেনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতিশীল থাকে, তাহলে আঞ্চলিক যুদ্ধের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো—তিগ্রাই থেকে লোহিত সাগরে যুদ্ধ এখনো ছড়িয়ে পড়েনি; কিন্তু যুদ্ধটি যে পথে এগোচ্ছে, তাতে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবকে উপেক্ষা করে এর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা আর সম্ভব নয়।










