ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশ নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। প্রশাসনের অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের আশঙ্কায় কেউ কেউ প্রকাশ্যে সিলিন্ডার বিক্রি না করে গোপনে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ এলপিজির দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বিক্রয়মূল্যের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর কিছু এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের খুচরা দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা নিজেরাই সরবরাহকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মূল্য ঘোষণার পর ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য সরবরাহকারীরা প্রায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন। এর সঙ্গে পরিবহন, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ যোগ হলে সরকারি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
বড় মগবাজার এলাকার এলপিজি ব্যবসায়ী আবদুল ওয়ারেস বলেন, সরকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাছ থেকেই প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছে। পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ যোগ করার পর ভোক্তা পর্যায়ে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজির বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সরবরাহ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে বলে তাদের ধারণা। কিন্তু সরবরাহ ও আমদানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে সংকট তৈরি হলে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের পরিবর্তে বাস্তব বাজার পরিস্থিতিই অনেক ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, নতুন দামে আমদানি করা ও বোতলজাত করা এলপিজির মজুত মঙ্গলবার থেকে বাজারে আসতে পারে। এর ফলে বুধবার থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
অক্টোবর মাসের জন্য বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। ভ্যাটসহ এই দাম সেপ্টেম্বরে ছিল ১৩২ টাকা ৮ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ টাকা ৯৮ পয়সা।
নতুন নির্ধারিত দামে ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮৪২ টাকা, ১২ দশমিক ৫ কেজির ১ হাজার ৯১৩ টাকা, ১৫ কেজির ২ হাজার ২৯৬ টাকা, ২০ কেজির ৩ হাজার ৬১ টাকা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৬ হাজার ৮৮৮ টাকা করা হয়েছে।
এলপিজিচালিত যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা। সেপ্টেম্বরে এই দাম ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা তরল এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১৪৯ টাকা ৩১ পয়সা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের ১২ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম অবশ্য অপরিবর্তিত রয়েছে। এই সিলিন্ডারের দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা। তবে বাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিলিন্ডারের সরবরাহ ও বাজার অংশ খুবই কম হওয়ায় অধিকাংশ ভোক্তার জন্য এর সুবিধা সীমিত।
বিইআরসি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য বৃদ্ধির কারণেই দেশে অক্টোবর মাসে দাম সমন্বয় করতে হয়েছে। সৌদি আরামকোর অক্টোবরের গড় চুক্তিমূল্য অনুযায়ী প্রোপেন ও বিউটেনের দাম প্রতি মেট্রিক টনে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলারে উঠেছে। সেপ্টেম্বরে এই দাম ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলপিজি সংরক্ষণ ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ ভ্যাট চালান দেওয়ার পাশাপাশি বোতলজাতের পর নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
তবে ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু খুচরা পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, দেশে এলপিজির প্রকৃত চাহিদা নতুন করে নিরূপণ, আমদানি ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত মুনাফার কারণে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।












