আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচটি পরিণত হলো এক আবেগঘন বিদায় উৎসবে। বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। বিদায়ী ম্যাচে নিজে একটি গোল করার পাশাপাশি দুটি গোলে সহায়তা করেছেন মেসি।
ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, রাতটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচের নয়। মেসির শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরার মুহূর্ত দেখতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল মনুমেন্টাল। জাতীয় সংগীতের সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশের দৃশ্যও ছুঁয়ে যায় সমর্থকদের।

মাঠের মাঝখানে মেসির বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির বিশাল প্রতিকৃতি রাখা হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল বিদায়ের বার্তা। ম্যাচের দশম মিনিটে বিশেষ শ্রদ্ধা জানাতে খেলা থামিয়ে দেওয়া হয়। পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে মেসিকে সম্মান জানায়। আতশবাজিতে আলোকিত হয়ে ওঠে আকাশ। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও মেসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাকে সম্মান জানান।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা একাধিক সুযোগ তৈরি করলেও গোল পায়নি। মেসিও কয়েকবার গোলের চেষ্টা করেন। তবে বেনিনের গোলরক্ষক তার একটি দূরপাল্লার শট ঠেকিয়ে দেন। বিরতিতে স্কোরলাইন ছিল ০-০।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৪৮ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি হেডে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। গোলের পর তিনি মেসিকে তুলে ধরে উদযাপন করেন। ওতামেন্দির জন্যও এটি ছিল বিশেষ মুহূর্ত, কারণ তিনিও আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ খেলছিলেন।
৬১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে আর্জেন্টিনা। মেসির নিখুঁত পাস থেকে গোল করেন নিকো পাজ। মেসির এটি ছিল ম্যাচের দ্বিতীয় অ্যাসিস্ট। তরুণ পাজের গোলটিকে অনেকেই আর্জেন্টিনার পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের প্রতীকী সংযোগ হিসেবেও দেখেছেন।

এরপর আসে রাতের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ৭১ মিনিটে আর্জেন্টিনা পেনাল্টি পায়। স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। বেনিনের গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে নিখুঁতভাবে বল জালে পাঠান তিনি। নিজের বিদায়ী ম্যাচে গোল—মেসির জন্য এর চেয়ে আবেগঘন সমাপ্তি আর কী হতে পারত!
শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। শেষ বাঁশির আগে মেসির একটি ফ্রি-কিক অবশ্য বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। সেটিই হয়ে থাকতে পারে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ কিক।
শেষ বাঁশির পর শুরু হয় আসল বিদায়পর্ব। পুরো মনুমেন্টাল মেসির নামে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। আলো ও আতশবাজির বিশেষ প্রদর্শনীতে তাকে সম্মান জানানো হয়। সতীর্থরা তাকে গার্ড অব অনার দেন। পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন মেসি এবং হাত নেড়ে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান।

বিদায়ী বক্তব্যের সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অনেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ও। এনজো ফার্নান্দেজসহ সতীর্থদের চোখে ছিল পানি। গ্যালারিতেও অসংখ্য সমর্থক কাঁদছিলেন। মেসির পরিবারকেও দেখা যায় আবেগাপ্লুত অবস্থায়।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির অধ্যায় শেষ হলো বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপাসহ এক অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার দিয়ে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে যে স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন তিনি, বিদায়ের রাতে সেটিই যেন আরও একবার ফিরে এলো।
বিদায়ী ম্যাচে একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে মেসি শুধু জয়ই এনে দেননি, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উপহার দিয়েছেন স্মরণীয় এক শেষ রাত। যে রাতের জন্য মনুমেন্টালে উপস্থিত হাজারো মানুষ হয়তো কখনোই প্রস্তুত ছিলেন না।












