যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও মুক্তবাণিজ্যবিরোধী অবস্থানের মধ্যেও মেক্সিকোর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে নিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং মার্কিন সরবরাহব্যবস্থায় মেক্সিকোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেশটিকে ট্রাম্পের শুল্কচাপ সামলানোর বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।
এর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর জুয়ারেজ। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের এল পাসোর ঠিক ওপারে অবস্থিত এই শহর একসময় ছিল তুলা চাষ ও স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর কারখানার জন্য পরিচিত। এখন সেখানে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সার্ভার। তাই ধুলো ও উত্তপ্ত মরুভূমির এই শহরই হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জুয়ারেজে তাইওয়ানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনভেন্টেকের বিশাল কারখানা তারই প্রতীক। কয়েক বছর আগে কারখানাটি নির্মাণ শুরু হলে স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে শপিং সেন্টার ভাবলেও পরে জানতে পারেন, এখানে এআই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় সার্ভার তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এর অর্থ নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ।
মেক্সিকো এখন যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা কম্পিউটার সার্ভারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরবরাহ করছে। এআই ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের দ্রুত বিস্তারের কারণে এই বাণিজ্য আরও বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—যা নতুন রেকর্ড।
এ অবস্থায় ট্রাম্পের নীতি এক ধরনের বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এআই প্রযুক্তিতে বিশ্বের শীর্ষ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, অন্যদিকে আমদানি কমিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এআই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ এখন মেক্সিকো থেকেই আসছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের গড় আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেক্সিকোর গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানিও নতুন শুল্কের আওতায় পড়েছে। তবে মেক্সিকোকে পুরোপুরি চাপের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ দুই দেশের অর্থনীতি এতটাই পরস্পরনির্ভর যে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা ও ভোক্তারাও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
মেক্সিকো ২০২৪ সালে কানাডাকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হয়। এরপরও ব্যবধান বেড়েছে। মেক্সিকোর কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে গাড়ি, যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিপণ্য—অসংখ্য পণ্যের ওপর মার্কিন বাজার নির্ভরশীল। আবার মেক্সিকোর খাদ্য ও শিল্প খাতও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য ও শিল্প উপকরণ আমদানি করে।
জুয়ারেজের এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের শিকড় আরও গভীরে। ১৯৬০-এর দশকে মেক্সিকো সীমান্ত এলাকায় রপ্তানিমুখী কারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি করে। পরে ১৯৯৪ সালে উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর মেক্সিকোর শিল্পায়ন আরও দ্রুত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো মেক্সিকোর তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় ও বিশাল ভোক্তা বাজারের সুযোগ নিতে সেখানে বিনিয়োগ বাড়ায়।
পরে ওই চুক্তির জায়গায় আসে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএ। ট্রাম্প নিজেই নাফটাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে নতুন চুক্তি করেন। কিন্তু এখন তিনি আবার চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তবে সীমান্তের বাস্তব অর্থনীতি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। মেক্সিকোর সাবেক বাণিজ্য আলোচক লুইস দে লা কায়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকোর সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ হবে বিপুল।
২০২৫ সালে মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পমহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরে ওয়াশিংটন ইউএসএমসিএর নিয়ম মেনে চলা পণ্যকে শুল্ক থেকে ছাড় দেয়। এতে মেক্সিকোর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই ছাড়ের আওতায় আসে।
জুয়ারেজের বর্তমান শিল্পবুমের আরেকটি বড় চালিকা শক্তি তাইওয়ানের কোম্পানিগুলো। ফক্সকন, ইনভেন্টেক, উইস্ট্রন ও পেগাট্রনের মতো বড় প্রতিষ্ঠান সেখানে কারখানা পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়ার পর এশিয়া থেকে কিছু উৎপাদন মেক্সিকোয় সরিয়ে আনার প্রবণতা বেড়েছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হচ্ছে ‘নিয়ারশোরিং’—অর্থাৎ বড় বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া।
প্রথমদিকে এসব কারখানায় স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি হলেও এখন এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদায় সার্ভার উৎপাদন দ্রুত বেড়েছে। গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি কোম্পানির ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরিতে মেক্সিকোর কারখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মেক্সিকোর প্রযুক্তি খাতও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। জুয়ারেজসহ চিহুয়াহুয়া রাজ্যে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ মেশিন লার্নিং, রোবোটিকসসহ আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণের জন্য নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্রও গড়ে তুলছে।
তবে এই এআই-নির্ভর শিল্পবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতাও আছে। গাড়ি শিল্পের তুলনায় সার্ভার কারখানায় কর্মসংস্থান কম, কারণ এখানে অনেক কাজই যন্ত্রনির্ভর। আবার একটি সার্ভারের দাম কয়েক লাখ ডলার থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে সার্ভার রপ্তানি মেক্সিকোর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আরও বাড়াচ্ছে—যা ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ কারণেই মেক্সিকো সরকার অন্য শিল্পের ওপর শুল্কচাপ এড়াতে সার্ভার রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করার উপায়ও খুঁজছে। কিন্তু এতে আবার যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ মেক্সিকোর ওপর চাপ তৈরি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই নিজের প্রযুক্তি উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে।
তবে মেক্সিকোর এই সাফল্যের সুফল পুরো দেশের মানুষের মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি। দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের শিল্পভিত্তিক এলাকাগুলো তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ হলেও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনো অনানুষ্ঠানিক ও অনিশ্চিত কাজে যুক্ত। কম মজুরি, সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সুফল সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
তারপরও মেক্সিকোর রপ্তানি খাত দেশটির অর্থনীতির সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশগুলোর একটি। এমনকি দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য ধরে রাখার বিষয়ে আগ্রহী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়েও মেক্সিকো আশাবাদী।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন অনিশ্চয়তা। জুয়ারেজে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ইউএসএমসিএ আলোচনার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প যখন শুল্ককে মাদক পাচার, বাণিজ্য ঘাটতি কিংবা রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার মতো নানা বিষয়ে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, তখন কোনো বাণিজ্য চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তবু জুয়ারেজের কারখানাগুলো থেমে নেই। নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে এবং এআই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাড়ছে। মেক্সিকোর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তাই শুধু কোনো চুক্তির কাগজে লেখা শর্তের ওপর নির্ভর করছে না; এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, বহু দশকের শিল্প অবকাঠামো এবং দুই দেশের অর্থনীতির গভীর পারস্পরিক নির্ভরতা।
ট্রাম্প সীমান্তে দেয়াল তুলতে পারেন, শুল্ক বাড়াতে পারেন, বাণিজ্য চুক্তির শর্ত বদলাতে পারেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর অর্থনীতিকে যে বাস্তব প্রয়োজন একে অন্যের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে, সেই মানচিত্র বদলানো অনেক কঠিন।












