কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বকে নতুন সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রযুক্তি একদিকে জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করছে, অন্যদিকে সাইবার হামলা চালানোর মতো বিপজ্জনক সক্ষমতাও অর্জন করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো এআইয়ের বিকাশে প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণ না রাখার নীতিতে অটল। তাদের অবস্থান অনেকটা—প্রযুক্তিকে নিজের গতিতে এগোতে দাও, বাধা দিয়ো না। কিন্তু প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, এআইকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এগোতে দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত ঝুঁকির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জননিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় এআই নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সম্ভাব্য বিপদের অনেক কিছুই ছিল তাত্ত্বিক পর্যায়ে। তখন নতুন প্রযুক্তির বিকাশে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন যুক্তি গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের শেষ দিকে এসে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, সাইবার নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং মানুষের পক্ষে সমাধান করা কঠিন গাণিতিক সমস্যাও এআই সমাধান করতে পারছে। ফলে প্রযুক্তির বিকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে।
এআই নিয়ে বাড়ছে মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগ
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে এআই নিয়ে একধরনের সন্দেহ ও উদ্বেগ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ের আগে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব পেত না। ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশটির প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এআইকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতেন। এখন সেই হার বেড়ে প্রায় অর্ধেকে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এআই নিয়ে উদ্বেগ আর শুধু প্রযুক্তিবিদ, গবেষক কিংবা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চিন্তারও অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো, এআইয়ের বিস্তারের জন্য বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন হচ্ছে। এসব স্থাপনার জন্য জমি, বিদ্যুৎ ও পানি দরকার। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে পরিবেশগত চাপ, বিদ্যুতের চাহিদা, সম্পদের ব্যবহার এবং নিজেদের এলাকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তির প্রতি ভীতি এবং নিজ এলাকার পরিবেশ ও জীবনযাত্রা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা একত্র হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেটা সেন্টারবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছে। মিশিগান থেকে টেক্সাস পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে মানুষের মনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—এআই কি শুধু তাদের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি মানুষের জীবনকেও বিপদের মুখে ফেলতে পারে? এত দিন যেসব গবেষক এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন, তাঁদের বক্তব্য এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্প্রতি কোডিং প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে একটি সাইবার হামলার ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওপেনএআইয়ের শত শত এজেন্টের একটি সমন্বিত দল বা ‘ঝাঁক’ ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছিল। এসব এআই এজেন্টের কার্যক্রম যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল না বলে উদ্বেগ তৈরি হয়। ঘটনাটিতে প্রাণহানি বা প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি হয়নি। তবু এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা কী ধরনের সাইবার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
কেউ কেউ ঘটনাটিকে এমন এক ভবিষ্যতের প্রাথমিক আভাস হিসেবে দেখছেন, যেখানে মানুষের পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই বিপুলসংখ্যক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। যদিও এই ঘটনা থেকে সরাসরি রোবটের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, তবু স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।
এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি উদাহরণ হলো অ্যানথ্রপিকের এক সাবেক কর্মীর পদত্যাগ। গত সেপ্টেম্বরে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রপিক ও এর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে একধরনের জুয়া খেলছে। তাঁর বক্তব্য এবং এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে সতর্কবার্তা তাঁকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে পরিচিত মুখ করে তুলেছে। তবে তাঁর অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
ট্রাম্পের নীতি কেন রাজনৈতিক চাপে পড়ছে
এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান বদলানোর তেমন লক্ষণ নেই। শুল্কনীতি কিংবা ইরানকে ঘিরে যুদ্ধসংক্রান্ত নীতির মতোই এ ক্ষেত্রেও জনমতের বিরোধিতা তাঁকে খুব একটা বিচলিত করছে না বলে মনে হচ্ছে। এর পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, এআইয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি আসলে চীনের স্বার্থ রক্ষার কৌশল হতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়নে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তাহলে চীন সেই সুযোগে এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ, এআই নিয়ন্ত্রণের বিতর্ককে তাঁরা শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে নয়, দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেও দেখছেন।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এআই খাতে বিধিনিষেধ আরোপ হলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সাফল্য নিয়ে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অনেকে এআই কোম্পানি এবং এই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসার প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করছেন। ফলে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা বাজারের মূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আর তাঁর দলের সব নেতার অবস্থান এক নয়। প্রেসিডেন্টের বিপরীতে রিপাবলিকান দলের অন্য নেতাদের নিয়মিত ভোটারদের মুখোমুখি হতে হয়। তাই এআই নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়লে তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়বে।
এই বাস্তবতা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। টেক্সাসে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কেন প্যাক্সটনের মতো কট্টর ট্রাম্পপন্থী রাজনীতিকও কিছু ডেটা সেন্টার নির্মাণ ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অর্থাৎ, এআইয়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সব সময় রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হবে—এমন ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
২০২৭ সালের মধ্যে কংগ্রেসে এআই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে দুই দলের আইনপ্রণেতাদের চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ, ভোটারদের উদ্বেগ উপেক্ষা করলে নির্বাচনে তার মূল্য দিতে হতে পারে। এই দিক থেকে এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের বিস্তারকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। তবে শুধু রাজনৈতিক চাপের কারণে নয়, প্রযুক্তির বাস্তব ঝুঁকি বিবেচনা করেও নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।
বিদ্যমান আইন কেন যথেষ্ট নয়
ট্রাম্প প্রশাসনের এআইবিষয়ক উপদেষ্টাদের একটি যুক্তি হলো, নতুন করে কঠোর আইন করার প্রয়োজন নেই। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে যে দায়বদ্ধতা ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত আইন রয়েছে, সেগুলোই যথেষ্ট। কোনো কোম্পানির পণ্য বা সেবার কারণে ক্ষতি হলে মামলা হতে পারে, ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে এবং ভবিষ্যতে এমন ক্ষতি এড়াতে কোম্পানিগুলোকে সতর্ক থাকতে হয়। বিমান, গাড়ি ও ওষুধশিল্পের উদাহরণ দিয়ে তাঁরা বোঝাতে চান, আইনি দায়ের ভয় এবং বিমা ব্যয়ের চাপই কোম্পানিগুলোকে দায়িত্বশীল রাখতে পারে।
কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে এই যুক্তির বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রচলিত শিল্পে কোনো পণ্যের কারণে ক্ষতি হলে আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। কারণ, এআই কীভাবে কাজ করবে, এর সক্ষমতা কত দ্রুত বাড়বে এবং কী ধরনের অপ্রত্যাশিত ক্ষতি হতে পারে, সে বিষয়ে বিচারকদের সামনে পর্যাপ্ত নজির নেই।
একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে হতে এআই হয়তো অর্থনীতির বড় অংশ বদলে দেবে। এমনকি কোনো গুরুতর বিপর্যয় ঘটে গেলে পরে ক্ষতিপূরণ আদায় করেও সেই ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নাও হতে পারে। মানুষের জীবনহানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি কিংবা বড় ধরনের সাইবার বিপর্যয় কেবল আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে সামাল দেওয়া যায় না।
এ কারণে এআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শুধু ক্ষতি হওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার খোঁজা যথেষ্ট নয়। সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকে চিহ্নিত করা, নিরাপত্তা যাচাই করা এবং বিপজ্জনক ব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নতুন প্রযুক্তি এলেই কেন নতুন নিয়ম প্রয়োজন
এআইকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এগোতে দেওয়ার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বার্থেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ট্রাম্প প্রশাসনও এআই খাতে ব্যাপক আত্মনিয়ন্ত্রণের ওপর আস্থা রাখছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, মানুষের জীবন ও সমাজে বড় প্রভাব ফেলে এমন নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নিয়মও তৈরি করতে হয়।
বিমান চলাচলের কথাই ধরা যাক। শুধু উন্নত বিমান তৈরি করলেই নিরাপদ আকাশপথ নিশ্চিত হয় না। বিমানের নিয়মিত পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আকাশপথে চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইভাবে সড়কে গাড়ি চালানোর জন্য গতিসীমা, পথ ব্যবহারের নিয়ম এবং আসনবেল্টের মতো নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
ওষুধের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়। কোনো নতুন ওষুধ বাজারে ছাড়ার আগে সেটি কার্যকর কি না এবং মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ক্ষতিকর ওষুধ মানুষের শরীরে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কারণে কতটি বিমান দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ওষুধজনিত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে, তার সঠিক হিসাব করা কঠিন। কারণ, যে দুর্ঘটনা ঘটেইনি, তার সংখ্যা সরাসরি গণনা করা যায় না। কিন্তু এ কারণে নিরাপত্তা বিধির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। বাস্তবে খুব কম মানুষই মনে করেন, বিমান, গাড়ি কিংবা ওষুধের ক্ষেত্রে কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকাই সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। প্রযুক্তির উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া এবং কোনো নিয়ম ছাড়াই প্রযুক্তিকে এগোতে দেওয়া—এই দুই চরম অবস্থানের মাঝখানে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
বড় বিপর্যয় ঘটার আগেই প্রস্তুতি জরুরি
এখন পর্যন্ত বিশ্ব এআইকে কেন্দ্র করে চেরনোবিলের মতো কোনো বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়নি। ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ভয়াবহ পরিণতির প্রতীক হয়ে আছে। এআইয়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বিপর্যয় না ঘটলেও ঝুঁকি নিয়ে আত্মতুষ্ট থাকার সুযোগ নেই।
হাগিং ফেসে সাইবার হামলার ঘটনাটি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি। এতে প্রাণহানি বা প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি না হলেও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপদের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এআইয়ের উন্নয়ন যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে কয়েক মাসের মধ্যেই উন্মুক্তভাবে ব্যবহারযোগ্য কিছু মডেল অ্যানথ্রপিকের ‘মাইথোস’ মডেলের সমপর্যায়ের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাইথোসকে এমন একটি মডেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাইবার ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং হ্যাকিংয়ের কাজে উল্লেখযোগ্য দক্ষতা দেখাতে পারে। এ ধরনের সক্ষমতা নিরাপত্তা গবেষণায় কাজে লাগতে পারে, আবার ভুল হাতে পড়লে সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
এখানে মূল সমস্যা প্রযুক্তির সক্ষমতা নয়, বরং সেই সক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিপজ্জনক ব্যবহার ঠেকানোর মতো ব্যবস্থা আছে কি না। শক্তিশালী এআই মডেল সহজলভ্য হয়ে উঠলে ক্ষতিকর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেগুলো ব্যবহার করে আগের তুলনায় জটিল আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করতে পারে।
তাই বড় কোনো বিপর্যয় ঘটার পর আইন তৈরির জন্য অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বিপর্যয়ের পর আতঙ্ক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে দ্রুত আইন তৈরি হলে সেখানে অতিরিক্ত কঠোরতা, অকার্যকর বিধিনিষেধ কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত সিদ্ধান্ত ঢুকে পড়তে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকির উদাহরণ ইতিমধ্যেই রয়েছে। কিছু প্রস্তাবে নির্দিষ্ট এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এআইয়ের অতিমানবীয় সক্ষমতা বা ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব প্রস্তাবের পেছনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, সব ক্ষেত্রে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর বা বাস্তবসম্মত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বড় সংকটের পর নেওয়া সিদ্ধান্তের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির আরেকটি উদাহরণ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা। ওই হামলার পর বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নতুন করে পর্যালোচনা করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দুটি দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, কোনো বিপর্যয়ের পর নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
এআই নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের করণীয় কী
এআইয়ের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অর্থ প্রযুক্তির অগ্রগতি বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে উদ্ভাবন অব্যাহত থাকে এবং একই সঙ্গে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি এআইয়ের উন্নয়ন সম্পূর্ণভাবে আটকে দেয়, তাহলে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র শুধু প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে না, বরং বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে এআইয়ের মাধ্যমে যে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব, তার সুযোগও হারাতে পারে।
আবার উন্নত এআই মডেলগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রাখাও ভালো সমাধান নয়। এমনকি সেগুলোকে নিরাপদে আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা গেলেও, উন্নত মডেল ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের সক্ষমতার ব্যবধান তৈরি হতে পারে। এর ফলে প্রযুক্তির সুবিধা ও ক্ষমতা অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে।
তাই নীতিমালার লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। বিশেষ করে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
প্রথমত, উন্নত এআই মডেলগুলোকে বিস্তৃত ও কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এসব পরীক্ষায় দেখতে হবে, মডেলগুলো সাইবার হামলা, বিপজ্জনক রাসায়নিক বা জৈব অস্ত্র তৈরির মতো ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা সম্ভব কি না। কোনো মডেলের মধ্যে গুরুতর ঝুঁকি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা যুক্ত না করা পর্যন্ত সেটির প্রকাশ বা ব্যবহার সীমিত রাখার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুতর ঘটনা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য করতে হবে। কোনো মডেল থেকে অপ্রত্যাশিত বিপজ্জনক আচরণ দেখা দিলে কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ক্ষতিকর ব্যবহার সম্ভব হলে সেই তথ্য গোপন রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়। দ্রুত তথ্য প্রকাশ করা গেলে অন্য প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাও একই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে পারবে।
তৃতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কাজ করা যেসব কর্মী নিরাপত্তার গুরুতর দুর্বলতা বা অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করেন, তাঁদের সুরক্ষা দিতে হবে। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই এমন সমস্যার বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন। কিন্তু চাকরি হারানো, পেশাগত ক্ষতি কিংবা আইনি হয়রানির আশঙ্কায় তাঁরা তথ্য প্রকাশ করতে চান না। আইনগত সুরক্ষা থাকলে তাঁরা জনস্বার্থে উদ্বেগের কথা জানাতে আরও উৎসাহিত হতে পারেন।
চতুর্থত, বড় এআই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্বাধীনভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকিতে যেমন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরীক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তেমনি এআই কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের প্রবেশাধিকার ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। এতে কোম্পানির নিজস্ব দাবি এবং বাস্তব নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
তবে এই নিয়ন্ত্রণের কাঠামো এমন হতে হবে, যাতে ছোট উদ্ভাবক ও গবেষকেরা অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় আটকে না যান। সব ধরনের এআই ব্যবস্থার ওপর একই মাত্রার বিধিনিষেধ আরোপ না করে, যেসব মডেল বড় ধরনের ক্ষতি ঘটানোর সক্ষমতা রাখে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ করা বেশি যুক্তিসংগত।
স্বেচ্ছা প্রতিশ্রুতি নয়, বাধ্যতামূলক বিধি প্রয়োজন
ট্রাম্প সম্প্রতি বড় এআই কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কিছু স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতি আদায় করেছেন। এসব প্রতিশ্রুতিতে নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের কিছু ধারণা উঠে এলেও শুধু কোম্পানির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
কোনো প্রতিষ্ঠান নিজের সুবিধা অনুযায়ী নিরাপত্তার মান নির্ধারণ করলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চাপের মধ্যে নিরাপত্তার কিছু বিষয় উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতিগুলোকে স্পষ্ট আইন ও বাধ্যতামূলক বিধিতে রূপান্তর করা প্রয়োজন। কোন ধরনের মডেলের ক্ষেত্রে কী পরীক্ষা করতে হবে, কোন ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, নিরাপত্তার ঘাটতি দেখা দিলে কী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নিয়ম ভাঙলে কী পরিণতি হবে—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করা দরকার।
এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এগিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও, শক্তিশালী এআই মডেল থেকে তৈরি হওয়া কিছু ঝুঁকি কোনো একটি দেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাইবার হামলা, বিপজ্জনক প্রযুক্তির বিস্তার কিংবা আন্তর্জাতিক অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের সম্ভাবনা মোকাবিলায় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মানে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা বন্ধ করা নয়। বরং প্রতিযোগিতা অব্যাহত রেখেও কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নীতি নিয়ে একমত হওয়া সম্ভব। এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়বে, সেই সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপত্তাবিধিও তত উন্নত করতে হবে।
প্রযুক্তির স্বাধীনতা ও জননিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য
এআই নিয়ে বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, উদ্ভাবনের গতি বজায় রেখে কীভাবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আবার কোনো নিয়ম না থাকলে কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতার চাপে নিরাপত্তা উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে তাই দুটি চরম পথের বাইরে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরির সুযোগ রয়েছে। একদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ ধরে রাখতে হবে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শুধু পুরোনো আইন ও কোম্পানির স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঘটনার বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন, তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষা এবং স্বাধীন তদারকি—এসব ব্যবস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বড় কোনো বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা না করা। দুর্ঘটনা ঘটার পর তার কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেয়ে আগে থেকে ঝুঁকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর।
প্রযুক্তির বিকাশ থামিয়ে দেওয়া যেমন সমাধান নয়, তেমনি সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়াও দায়িত্বশীল নীতি হতে পারে না। এআইয়ের সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়মও তত দ্রুত ও কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে হবে। তাই ‘যা হওয়ার হোক, প্রযুক্তিকে এগোতে দাও’—এমন নীতি শেষ পর্যন্ত কোনো টেকসই সমাধান দিতে পারবে না। এআইয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উদ্ভাবনের স্বাধীনতা ও জননিরাপত্তার মধ্যে কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা যায়, তার ওপর।












