কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে চান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের লক্ষ্য, এআইয়ের উন্নয়ন ও ব্যবহার যতটা সম্ভব দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, যাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এই পরিকল্পনার সামনে বড় বাধা হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ, প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন এবং এআই নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের ক্রমবর্ধমান দাবি। ফলে এআইয়ের বিকাশকে অবাধ রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকারি ওয়েব পোর্টাল ‘আমেরিকা ডট গভ’ চালুর আয়োজনটি ছিল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নতুন পণ্য উন্মোচনের অনুষ্ঠানের মতো জাঁকজমকপূর্ণ। সাধারণত সরকারি ওয়েবসাইট চালুর ঘোষণা যেভাবে দেওয়া হয়, এর আয়োজন ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি চাকচিক্যময়। কর্মকর্তারা দাবি করেন, গুগল ও স্পেসএক্সএআইয়ের বৃহৎ ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল দিয়ে পরিচালিত এই পোর্টাল সরকারি সেবা পাওয়ার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অনুষ্ঠানে এমনভাবে বক্তব্য দেন, যেন তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, এআই চ্যাটবটের সাহায্যে নাগরিকদের জন্য পাসপোর্টের মতো সরকারি সেবা পাওয়া আরও সহজ হবে। সরকারের দাবি, নতুন প্রযুক্তি মানুষের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ সহজ করবে এবং বিভিন্ন সেবা পেতে সময় ও ঝামেলা কমাবে।
এই আয়োজনের পর হোয়াইট হাউসে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। সেখানে এআই ব্যবহারের নিয়ম ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের মধ্যে একটি ‘সংবিধান’ বা নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ সামনে আসে। এরপর ৪ অক্টোবর ট্রাম্প প্রশাসন ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেয়। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ট্রাম্প এখন এআইয়ের এমন একটি উন্নত পর্যায়কে সামনে আনছেন, যা মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলনীয় বা তার চেয়েও বেশি সক্ষম হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেবেন। এআই নিয়ে সরকারের কার্যক্রম সমন্বয় করাই হবে তাঁর দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব কেবল এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রযুক্তির ব্যবহারকারী এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও সরকারের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য হলো এআই নিয়ে সংশয়ী মার্কিন নাগরিকদের কাছে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য সুবিধা তুলে ধরা। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, এআইয়ের দ্রুত বিকাশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সরকারি সেবা এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই প্রচারের পেছনে রয়েছে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিপুলসংখ্যক মানুষ যেখানে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে এর বিকাশ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প।
জনমতের বিপরীতে ট্রাম্পের অবস্থান
এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ প্রযুক্তিটির দ্রুত বিকাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক চান, শক্তিশালী এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করা হোক অথবা প্রয়োজনে বন্ধ রাখা হোক। এই মনোভাব শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রিপাবলিকানদের মধ্যেও এ ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ৯০ শতাংশের বেশি মার্কিন নাগরিক এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতিমালা চান।
জনমতের এই চিত্র ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কারণ এআই নিয়ে মানুষের উদ্বেগ যত বাড়ছে, প্রযুক্তি খাতকে অবাধে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার নীতি তত বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
কিন্তু ট্রাম্প আপাতত এই উদ্বেগের ভিত্তিতে এআইয়ের বিকাশ সীমিত করতে রাজি নন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এআই নিয়ে বিভিন্ন আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন প্রচার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবিত আইনগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, এসব উদ্যোগ এআইয়ের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে তিনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের উদ্যোগে নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
ট্রাম্পের যুক্তি, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্পের গতি কমে যেতে পারে। এর ফলে চীন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু এআই মডেলগুলো যত বেশি শক্তিশালী ও জটিল হচ্ছে, ততই নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। আর এই উদ্বেগ ভোটারদের মনোভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান ভবিষ্যতে আরও বেশি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পকে প্রভাবিত করতে লড়াইয়ে বিভিন্ন পক্ষ
এআই নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান নির্ধারণে তাঁর প্রশাসনের ভেতরে এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউ এআইয়ের সম্ভাবনার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, আবার কেউ এর ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর নিয়মকানুনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দুই কর্মকর্তা—অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস—দীর্ঘদিন ধরেই এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সচেতন। বিশেষ করে বেসেন্টের উদ্বেগ, নিয়ন্ত্রণহীন বা ভুলভাবে কাজ করা এআই মডেল যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
আর্থিক খাতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রভাবও বাড়ছে। কোনো শক্তিশালী মডেল ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করলে কিংবা অপ্রত্যাশিত আচরণ করলে তার প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে বেসেন্টের মতো নীতিনির্ধারকেরা এআইয়ের বিকাশের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পক্ষে।
প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোডেই এবং গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্যার ডেমিস হাসাবিস। তাঁরা এআইয়ের দ্রুত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যথাযথ আইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
তবে প্রযুক্তি খাতের অন্য নেতাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে জটিল। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান প্রকাশ্যে আমোডেইয়ের এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বানের সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান একই সময়ে ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ নামের একটি রাজনৈতিক তহবিলে বিপুল অর্থ দিয়েছেন। এই তহবিল অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।
ইলন মাস্কের অবস্থানেও একই ধরনের দ্বৈততা দেখা যায়। তাঁর প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সএআইয়ের সঙ্গে যুক্ত এআই কার্যক্রমের পাশাপাশি তিনি এআই গবেষণাগারগুলোর একে অন্যের মডেল পর্যালোচনার ধারণাকে সমর্থন করেছেন। আবার প্রকাশ্যে আমোডেইয়ের অবস্থানের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে প্রযুক্তি খাতের নেতাদের মধ্যেও এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে একক অবস্থান নেই।
নিয়ন্ত্রণবিরোধীদের প্রভাব বেশি
এত মতপার্থক্য থাকলেও এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে এআইয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিরোধীরা। এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন ট্রাম্পের এআইবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিনিয়োগকারী ডেভিড স্যাকস, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং মেটার সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ।
এনভিডিয়া এআই ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চিপ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য এআই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে মেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগকারী। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে এআইয়ের দ্রুত বিকাশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
নিয়ন্ত্রণবিরোধী পক্ষের যুক্তি, এআই নিয়ে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা অনেক ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত। তাদের মতে, বিদ্যমান আইন ও নিয়ম দিয়েই অনেক ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব। এর বাইরে নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাঁদের আরেকটি আশঙ্কা হলো, এআই খাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। এতে নতুন প্রযুক্তি তৈরি, গবেষণা এবং অবকাঠামো নির্মাণের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এআইকেন্দ্রিক ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টিও তাঁদের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এআইয়ের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে, আর চীন তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রযুক্তির উন্নয়ন চালিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে।
নিয়ন্ত্রণবিরোধীদের আরেকটি যুক্তি হলো, এআইয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল মডেলগুলো মূল্যায়ন করার মতো দক্ষ জনবল সরকারের হাতে পর্যাপ্ত নেই। উন্নত মডেলগুলো কীভাবে কাজ করে, কোথায় ভুল করতে পারে এবং কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করতে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানির মতো উচ্চ বেতন দিয়ে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করা কঠিন।
এই যুক্তির পক্ষে তাঁরা ব্যয়ের ব্যবধানও তুলে ধরছেন। এআই মডেল মূল্যায়নের জন্য অ্যানথ্রপিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যাকসেঞ্চারের সঙ্গে পাঁচ বছরের যে অংশীদারত্ব করেছে, তার ব্যয় প্রায় ২০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এআই নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা সিএআইএসএসআইয়ের বার্ষিক বাজেট মাত্র দেড় কোটি ডলার।
এই বিশাল ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, উন্নত এআই মডেল মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অর্থ এবং দক্ষ জনবল জোগাড় করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই সীমাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে এককভাবে যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা কেন দুর্বল হলো
নিয়ন্ত্রণবিরোধীদের যুক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। চলতি গ্রীষ্মে বেসেন্ট ও ওয়াইলসের সমর্থন পাওয়া একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এআই নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
২৯ সেপ্টেম্বর প্রযুক্তি খাতের নেতাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের সময়ও এ বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্পের দুই পাশে ছিলেন এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ও ইলন মাস্ক। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকের প্রধান আমোডেইকে টেবিলের এক প্রান্তের কাছাকাছি বসানো হয়েছিল। আয়োজনের এই দৃশ্য এআই নীতিনির্ধারণে বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব ও অবস্থান নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
সেই বৈঠকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি যৌথ সমঝোতা হয়। ট্রাম্প এটিকে ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ বলে বর্ণনা করেন। সমঝোতায় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার এবং হ্যাকিংসহ অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি স্বাধীন নিরীক্ষকদের সঙ্গে কাজ করে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়।
কাগজে-কলমে এই উদ্যোগকে এআই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখানো হলেও এর বাস্তব প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ অধিকাংশ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই এ ধরনের কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করছিল। ফলে নতুন সমঝোতা তাদের কার্যক্রমে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। সরকার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর আইন চাপিয়ে দিতে চাইছে না; বরং তাদের স্বেচ্ছায় নিয়ম মেনে চলার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জননিরাপত্তার প্রয়োজন সব সময় এক জায়গায় মিলবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়।
আইন ছাড়াই এআই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
ট্রাম্পের সামনে একটি সম্ভাব্য পথ হলো, তিনি কংগ্রেসের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়নের বিরোধিতা অব্যাহত রাখবেন, কিন্তু প্রয়োজনে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবেন।
ইতিমধ্যে তাঁর প্রশাসন দেখিয়েছে, প্রয়োজন মনে করলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রযুক্তি খাতে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন বা এফটিসি অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই এবং আরও কয়েকটি এআই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মডেল মূল্যায়নকারী অলাভজনক সংস্থা এমইটিআর-এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তের বিষয় হিসেবে অন্যায্য বা বিভ্রান্তিকর ব্যবসায়িক আচরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইকে তাদের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলের নতুন ব্যবহারকারীদের বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে প্রশাসনের অনুমোদন চাইতে হচ্ছে। এই ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে লাইসেন্সিং পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করা না হলেও বাস্তবে অনেকটা সেই ধরনের নিয়ন্ত্রণের মতো কাজ করছে।
যুক্তরাজ্যের এআই নিরাপত্তা সংস্থা এআই সেফটি ইনস্টিটিউটও সম্প্রতি একটি সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে কিছু উন্নত এআই মডেলে আগাম প্রবেশাধিকার পেত, যাতে সেগুলোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করা যায়। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নকারীদের আগে এসব মডেল পর্যালোচনার সুযোগ দিতে হবে। এর ফলে ব্রিটিশ সংস্থাটি আগের মতো আগাম প্রবেশাধিকার হারিয়েছে।
এসব পদক্ষেপ দেখায়, ট্রাম্প একদিকে প্রকাশ্যে কঠোর এআই নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করছেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগও রাখছেন। অর্থাৎ, তাঁর নীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমুক্ত এআইয়ের পক্ষে নয়; বরং কংগ্রেসের মাধ্যমে বিস্তৃত ও স্থায়ী আইন তৈরির পরিবর্তে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল একটি পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে।
নির্বাহী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে বাড়তে পারে পক্ষপাতের ঝুঁকি
হোয়াইট হাউসের একটি বড় উদ্বেগ হলো, এআই নিয়ে এখনই বিস্তৃত ও কঠোর নিয়মকানুন তৈরি করা হলে ভবিষ্যতের কোনো প্রশাসন সেই আইনকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। ডানপন্থী একটি নীতিপ্রচারমূলক সংগঠন অ্যালায়েন্স ফর আ বেটার ফিউচারের জ্যানেট কেলির মতে, হোয়াইট হাউস এমন একটি বড় বিধিবিধানের কাঠামো তৈরি করতে চায় না, যা পরবর্তী প্রশাসনের হাতে অপব্যবহারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই উদ্বেগের বিপরীত দিকও রয়েছে। কংগ্রেসের মাধ্যমে স্থায়ী আইন না করে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নির্ভর করলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও অনিশ্চিত ও খামখেয়ালি হয়ে উঠতে পারে। তখন একই ধরনের কাজ করা দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রশাসনের পছন্দের কোনো প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে, আর অন্য প্রতিষ্ঠান কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে এনভিডিয়ার মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ সামনে আসে। এআইয়ের বিকাশে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে এআই খাত নিয়ন্ত্রণ করা হলে কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের সুবিধা বা বাধার মুখে পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এই বিতর্কের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। গত ছয় মাসে এআই শিল্পের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ শেয়ারবাজার সূচকের মোট উত্থানের অর্ধেকেরও বেশি অংশে অবদান রেখেছে। ফলে এআই খাতের বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মূল্য এবং সামগ্রিক শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে একদিকে জননিরাপত্তা ও জবাবদিহির দাবি বাড়ছে, অন্যদিকে এআই শিল্পের প্রবৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও বাড়ছে অসন্তোষ
এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ শুধু বিরোধী দল বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের একটি অংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়া এবং অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে পক্ষপাত দেখানোর অভিযোগ তুলে আসছেন।
এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই শিশুদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি রাজনৈতিক বিভাজন পেরিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত মনোভাবের একটি উদাহরণ হলো ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের সিদ্ধান্ত। তিনি ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ নামের রাজনৈতিক তহবিলে আরও আড়াই কোটি ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। ওপেনএআইয়ের কর্মীদের তীব্র বিরোধিতার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি দেখায়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও এআই নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক লড়াই নিয়ে মতবিরোধ বাড়ছে।
ওয়াশিংটনেও এআই নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে সমর্থন বাড়ছে। জ্যানেট কেলির ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন পক্ষ অন্তত একটি বিষয়ে একমত হচ্ছে—কিছু একটা করা প্রয়োজন। এই মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের আইনপ্রণেতারাই এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন।
আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে কংগ্রেস এআই নিয়ন্ত্রণে আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতির ওপর সরাসরি রাজনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কংগ্রেস কোনো কার্যকর আইন প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হলেও বিতর্ক থেমে থাকবে না। কেলির মতে, সে ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলো নিজস্ব আইন প্রণয়নের পথে এগোতে পারে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এআই ব্যবহারের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম তৈরি হতে পারে। এতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠবে, কারণ একেক অঙ্গরাজ্যে তাদের ভিন্ন নিয়ম মেনে চলতে হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটি অভিন্ন জাতীয় নীতিমালার অভাব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ব্যবহারকারী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। আবার জাতীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরোধিতাকারীরা মনে করতে পারেন, অঙ্গরাজ্যগুলোর পৃথক আইন উদ্ভাবনের গতি কমিয়ে দেবে। ফলে এআই নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আপত্তি, তবে আইন প্রণয়নের পথ খোলা
ট্রাম্প প্রশাসন এআইয়ের ওপর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির ধারণার প্রতিও আপত্তি জানিয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা মাইকেল ক্রাটসিওস আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থার ধারণার সমালোচনা করেন।
এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা। প্রশাসনের আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একক নিয়ম তৈরি করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে অভিন্ন নিয়ম তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।
তবে ক্রাটসিওস একই বক্তব্যে স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এআই নিয়ে আইন প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করলেও দেশের ভেতরে আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা প্রশাসন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে হোয়াইট হাউসের যৌথ সমঝোতাতেও এই সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছায় নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোকে আইন বা বিধিবিধানের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ দেওয়া যুক্তিসংগত হতে পারে। ফলে বর্তমান সমঝোতাকে ভবিষ্যতের আইনগত কাঠামোর বিকল্প হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য একটি অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে এক ধরনের নমনীয়তা দেখা যায়। একদিকে সরকার এখনই বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়নে আগ্রহী নয়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে আইন প্রণয়নের পথও পুরোপুরি বন্ধ রাখতে চায় না।
দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি, কঠিন হয়ে উঠছে রাজনৈতিক হিসাব
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। জনমতের পরিবর্তন, রাজনৈতিক সমর্থকদের চাহিদা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোনো তাঁর রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এআই নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর জন্য বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কারণ, অন্য অনেক নীতিগত বিতর্কের তুলনায় এআই নিয়ে জনমতের পরিবর্তন ঘটছে অত্যন্ত দ্রুত। প্রযুক্তিটির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, নতুন নতুন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের ধারণাও বদলে যাচ্ছে। ফলে আজ যে প্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটি অল্প সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। সরকার চাইলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছায় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের ওপর নির্ভর করতে পারে। প্রয়োজনে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে। আবার জনমতের চাপ এবং কংগ্রেসের উদ্যোগের মুখে শেষ পর্যন্ত নতুন আইন প্রণয়নের পথেও যেতে হতে পারে।
প্রতিটি পথেরই সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কঠোর আইন এআইয়ের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে তা যেন উদ্ভাবনের গতি অযথা বাধাগ্রস্ত না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে কেবল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে নিরাপত্তার মান কতটা কার্যকরভাবে বজায় থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
এআইয়ের বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং উদ্ভাবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের বর্তমান নীতি প্রযুক্তি খাতকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু জনমতের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক চাপকে উপেক্ষা করলে সেই নীতিই তাঁর জন্য নতুন সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এআই নিয়ে ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখা যায়, অথচ একই সঙ্গে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও উদ্বেগকেও গুরুত্ব দেওয়া যায়। প্রযুক্তির অগ্রগতি যত দ্রুত হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার রাজনৈতিক সময়ও তত কমে আসছে।












