ভারতের তরুণদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, মতপ্রকাশ এবং মানসিক স্বাস্থ্য ও লিঙ্গসমতা নিয়ে কথা বলার কারণে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক জিনা রোমেরোর উত্থাপিত এসব অভিযোগকে ‘শোনা কথা ও যাচাইহীন দাবি’ বলে আখ্যা দিয়েছে ভারত। দেশটির দাবি, নাম প্রকাশ না করা ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বিপুলসংখ্যক মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণীকরণ করা হয়েছে।
১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটির ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির প্রতিনিধি অনুজ স্বরূপ রোমেরোর প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সংবিধানের সুরক্ষার কথা তুলে ধরল ভারত
জাতিসংঘে ভারতের প্রথম সচিব অনুজ স্বরূপ বলেন, দেশটির সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের মতপ্রকাশ, বাক্স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এসব অধিকারের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
স্বরূপের অভিযোগ, বিশেষ প্রতিবেদকের প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি যথেষ্ট নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর নয়। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে পাদটীকায় নামহীন ব্যক্তিদের দেওয়া বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার একটি দেশের তরুণদের নিয়ে এমন বিস্তৃত অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে আরও শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বেনামি ও যাচাই না করা তথ্যের ভিত্তিতে করা অভিযোগকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এ কারণেই ভারত প্রতিবেদনটির বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে।
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের উদাহরণ
ভারতের প্রতিনিধি দাবি করেন, প্রতিবেদনটি দেশটির নাগরিক সমাজের বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারেনি। এর পক্ষে তিনি তরুণদের রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
স্বরূপ বলেন, প্রতিবেদনেই ভারতীয় তরুণদের একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা এসেছে। তাঁর প্রশ্ন, যে দেশে তরুণদের একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ সরকারকে প্রকাশ্যে প্রশ্ন করতে পারে, রাজধানীতে মিছিল করতে পারে এবং পরে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে, সেই পরিস্থিতিকে কীভাবে সম্পূর্ণ দমনমূলক পরিবেশের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়?
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সেপ্টেম্বরের একটি বক্তব্যও উল্লেখ করেন তিনি। স্বরূপের ভাষ্য, তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ক্ষেত্রে তরুণ নেতাদের সঙ্গে সংলাপ কার্যকর হতে পারে বলে তুর্ক মানবাধিকার পরিষদে মন্তব্য করেছিলেন।
রোমেরোর অভিযোগ কী ছিল
গত ১০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া কয়েকটি পোস্টে জিনা রোমেরো ভারতের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং নির্বিচারে আটক করার অভিযোগ তোলেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধের অভিযোগও উল্লেখ করেন।
রোমেরোর দাবি ছিল, আড়াই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে প্রত্যন্ত এলাকার আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভারতের প্রতিনিধি জাতিসংঘে আপত্তি জানিয়েছেন।
তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান
বক্তব্যের শেষ দিকে অনুজ স্বরূপ বিশেষ প্রতিবেদককে অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বেনামি বক্তব্যের ভিত্তিতে ১৪০ কোটি মানুষের পরিস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল প্রতিবেদন তৈরির মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভারতের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তরুণদের অধিকার ও বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক এবং নয়াদিল্লির মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।












