বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর ঢাকায় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালুর উদ্যোগ নতুন করে নিয়েছে সরকার। এবার পরিবহন মালিকেরাও সমর্থনের কথা দিয়েছেন। ৮ অক্টোবরের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সাত কর্মদিবসের মধ্যে দুটি রুটে সেবা চালু হবে। দুই মাসের মধ্যে ৩২টি রুটের ফ্র্যাঞ্চাইজি চূড়ান্ত হবে। আর ছয় মাসের মধ্যে পুরো ব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগ আর শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে প্রশ্নের সমাধান এখনো হয়নি।
ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএর হিসাবে রাজধানীতে অনুমোদিত রুট ৪১৮টি। এর মধ্যে চলছে মাত্র ৯৮টি। এসব রুটে ৬৬টি কোম্পানির প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাস চলে। একই পথে একাধিক রুট, ফিটনেসবিহীন বাস আর যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতা যানজট আর দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। ৯৮টি রুটকে ৩২টিতে আনতে ডিটিসিএ ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামার ধরন জরিপ করেছে। ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রার শুরু আর গন্তব্যও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত রুটের ৭০ শতাংশ বর্তমান রুটের সঙ্গে মিলে যায়।
বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে থাকবে একটি নির্দিষ্ট অপারেটর। বাসের রং হবে একই রকম, থাকবে নির্দিষ্ট স্টপেজ। টিকিট মিলবে কাউন্টারে আর ইলেকট্রনিক উপায়ে। প্রতিটি বাসে থাকবে জিপিএস। ১২ মিটার লম্বা ৫২ আসনের বাস চালানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আর চাঁদা আদায় নিষিদ্ধ থাকবে। অগ্রাধিকার পাওয়া পাঁচটি করিডর হলো বেরাইদ থেকে সদরঘাট, নন্দন পার্ক থেকে ডেমরা, কাঁচপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি থেকে কেরানীগঞ্জ আর শ্রীপুর থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির। মেট্রোরেল স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত ২৫টি বৃত্তাকার রুট নিয়েও কাজ চলছে।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান জানান, ৬৬টি কোম্পানি পাঁচটি অপারেটিং গ্রুপে ভাগ হবে। বাসের সংখ্যা অনুযায়ী তারা রুটের আয় ভাগ করে নেবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত সচিব এস এম খোকন বলেন, মালিকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই আগের উদ্যোগ আটকে গিয়েছিল। মালিকেরা চালক আর সহকারীকে কর্মঘণ্টার বদলে প্রতি ট্রিপের ভিত্তিতে মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। ঢাকার যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলছে, একই রুটে কয়েকটি কোম্পানির বাস যাত্রী তোলার জন্য প্রতিযোগিতা করে। কেউ রাস্তার মাঝখানে থামে, কেউ ধাক্কা দিয়ে আগে যেতে চায়। এতে দুর্ঘটনা বাড়ে, যানজটও লাগে। বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় এক রুটে এক অপারেটর থাকলে এই প্রতিযোগিতা থাকবে না বলে আশা করছে ডিটিসিএ। যাত্রীদেরও কাউন্টার থেকে টিকিট কাটার অভ্যাস গড়তে হবে। নারী যাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত আসন আর হয়রানি বন্ধে নজরদারি রাখার দাবিও উঠেছে। পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় বাস সরিয়ে নতুন বাস নামানো না গেলে শুধু রুট বদলে খুব বেশি লাভ হবে না।
এখানেই বড় ঝুঁকি। ট্রিপভিত্তিক মজুরি মানে বেশি ট্রিপের তাড়া, আর সেটাই ঢাকার রাস্তায় বেপরোয়া চালনার মূল কারণ। নির্দিষ্ট বেতন আর কর্মঘণ্টা নিশ্চিত না হলে রং বদলালেও বাসের আচরণ বদলাবে না। ২০১৫ সাল থেকে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়ে বহু ঘোষণা এসেছে। ২০২১ সালে ঘাটারচর থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত চালু হওয়া পরীক্ষামূলক রুটও বেশি দূর এগোয়নি। এবার ছয় মাসের সময়সীমা রক্ষা হয় কি না, সেটাই দেখার বিষয়।












