রংপুরের একটি সাততলা বস্ত্র কারখানা জিতে নিয়েছে স্থাপত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ। কারখানাটির নাম গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি। এটি চালায় কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড, যারা হাতে তৈরি রাগ আর অন্যান্য বস্ত্রপণ্য উৎপাদন করে। নকশা করেছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টস। রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস বা রিবা দুই বছর পরপর এই পুরস্কার দেয়। একক ভবনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সম্মানজনক স্বীকৃতি। রিবা পুরস্কার জয় বাংলাদেশের স্থাপত্যের জন্য বড় অর্জন।
এক লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটের বেশি জায়গাজুড়ে কারখানাটি। এখানে আছে শান্ত উঠান, পুকুরের পাশে হাঁটার পথ আর সবুজ গাছে ঢাকা সম্মুখভাগ। বিচারকেরা একে নিঃশব্দ বিনয়ের কাজ বলে বর্ণনা করেছেন। আয়োজকেরা বলেছেন, এই নকশা প্রকৃতিকে সরাসরি কর্মস্থলে নিয়ে এসেছে। শ্রমিকদের জন্য আছে ছাদে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, চিকিৎসা কেন্দ্র আর বিশ্রামের ছায়াঘেরা জায়গা। প্রবেশপথে নারীর একটি বড় ভাস্কর্য রাখা হয়েছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক বলে জানিয়েছেন স্থপতিরা। এই অর্জন দেশের স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা।
সেপ্টেম্বরে রিবার বিচারক প্যানেল কারখানা পরিদর্শন করে। তাঁরা বলেছেন, এই প্রকল্প কারখানার নকশা আর পরিচালনার একটি বিকল্প মডেল দেখিয়েছে। কর্মীর ভালো থাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, ভাঙা হয়েছে প্রচলিত সামাজিক ভেদাভেদ। জুরির সভাপতি ভারতীয় স্থপতি বিজয় জৈন কারখানার বড় কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের প্রশংসা করেছেন। শ্রমিক, ব্যবস্থাপক আর মালিক সবাই একই দরজা দিয়ে ঢোকেন। নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা বায়েজিদ এম খন্দকার বলেছেন, তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন শিল্পও শ্বাস নিতে পারে। তাঁর মতে, কারখানা মানুষের শক্তি শুষে নেওয়ার যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, বরং শক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার জায়গা হওয়া উচিত।
এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প ছিল। অন্যটি ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। বাকি দুই চূড়ান্ত প্রতিযোগী ছিল বেলজিয়ামের। একটি সংস্কার করা ১৯৬০-এর দশকের অফিস ভবন, অন্যটি সম্প্রসারিত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান। এর আগে মেরিনা তাবাসসুমের বায়তুর রউফ মসজিদ আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার জিতেছিল। বাংলাদেশি স্থপতিরা যে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছেন, রিবা পুরস্কার জয় তারই প্রমাণ। নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের জন্য বড় শহরের বাইরে রংপুরের মতো জায়গায় কাজ করে বিশ্বসেরা স্বীকৃতি পাওয়া বিশেষ অর্জন। কারুপণ্য রংপুর মূলত হাতে বোনা রাগ আর শতরঞ্জি তৈরি করে, যা বিদেশে রপ্তানি হয়। হাতে বোনার এই কাজে নারী কর্মীদের ভূমিকা বড়। ফলে কারখানার নকশায় দিবাযত্ন কেন্দ্র আর স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রাখা ছিল বাস্তব প্রয়োজন। রিবা পুরস্কার জয় দেখিয়ে দিল, এমন বাস্তব প্রয়োজনকে সুন্দর স্থাপত্যে রূপ দেওয়া যায়। দেশের অন্য শিল্পোদ্যোক্তারাও এখন এই মডেল নিয়ে আগ্রহ দেখাতে পারেন।
এই স্বীকৃতির তাৎপর্য স্থাপত্যের বাইরেও। রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের কারখানা মানেই বিশ্বের কাছে ছিল ঝুঁকির ছবি। এখন দেশে সবুজ কারখানার সংখ্যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। রংপুরের মতো উত্তরের জেলায় এমন কারখানা দেখিয়ে দিল, শ্রমিকবান্ধব নকশা ঢাকার বাইরেও সম্ভব। পোশাক আর বস্ত্র খাতের মালিকেরা এই মডেল থেকে শিক্ষা নিলে শ্রমিকের জীবন আর ক্রেতার আস্থা দুটোই বাড়বে।












