আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে বিশ্বে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি তৈরি হবে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। ব্যাংককে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী আর বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে তিনি এ কথা বলেন। এই সময়ে ১২০ কোটি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করবে। কিন্তু পূর্বাভাস বলছে, কাজ তৈরি হবে মাত্র ৪০ কোটি। বাঙ্গার মতে, চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদা। কর্মসংস্থানের ঘাটতি বাংলাদেশের মতো তরুণপ্রধান দেশের জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা।
বাঙ্গা বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে সংকট ছিল, তা কমেনি। সংঘাত চলছে, সরকারগুলোর খরচের সুযোগ কমেছে, ঋণের বোঝা বেড়েছে। জ্বালানি থেকে সার পর্যন্ত জরুরি পণ্যের দাম এখনো চড়া। এই অবস্থায় তিনি উন্নয়ন অর্থায়নে বড় পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। সরকারি অর্থ, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য তহবিল আর প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। যেখানে প্রয়োজন আর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেখানে সহজ শর্তের ঋণ জরুরি থাকবে। অর্থনীতি শক্ত হলে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা বাড়াতে হবে। বাঙ্গা বলেছেন, উন্নয়ন সহযোগিতার সাফল্য তখনই আসে, যখন একটি দেশের আর সহায়তার দরকার হয় না। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট, নিজস্ব বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানই টেকসই পথ।
বিশ্বব্যাংক গত বছর বেসরকারি খাত থেকে ১১২ বিলিয়ন ডলার জোগাড় করেছে। ২০২২ অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। নিজস্ব ঋণসহ মোট অর্থায়ন ছাড়িয়েছে ২৩০ বিলিয়ন ডলার। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে বেসরকারি অর্থ জোগাড় প্রায় তিন গুণ হয়েছে। বাঙ্গা আরও জানিয়েছেন, ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিনিয়োগ মূল্যায়ন আর হস্তান্তরের অভিন্ন পদ্ধতি তৈরি করছে। এতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন করা প্রকল্প অন্য বিনিয়োগকারী কিনে নিতে পারবে। ফলে নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থ মুক্ত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই কর্মসংস্থানের ঘাটতি অনেক বেশি বাস্তব। দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে আসে। শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে, নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রগতি সীমিত। বেশির ভাগ কাজ অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে মজুরি কম আর সামাজিক সুরক্ষা নেই। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় ভালো বেতনের নতুন চাকরি কম তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রবৃদ্ধি হলেও দারিদ্র্য কমছে না, উল্টো বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন সাড়ে ২২ শতাংশ। শুধু গত অর্থবছরেই নতুন করে গরিব হয়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এর বড় কারণ কর্মসংস্থানের ঘাটতি আর মূল্যস্ফীতি। কাজ থাকলেও মজুরি দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে কাজ খুঁজতে তরুণেরা বিদেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেক সময় বড় ঝুঁকি নিয়ে। দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে এই চাপ সামনে আরও বাড়বে বলে সতর্ক করছেন তাঁরা।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শুক্রবার জানিয়েছেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের কর্মসূচিতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন সেই অর্থ কর্মসংস্থান তৈরিতে কতটা কাজে লাগে, সেটাই দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি শিল্পে সহজ ঋণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা আর কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া তরুণদের জন্য কাজ তৈরি সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য সময়মতো এসেছে।












