জুলাই সনদের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই সনদে সই করেন তখনকার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। গণঅভ্যুত্থানের পর দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে এটি তৈরি হয়। এই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, সংক্ষেপে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার সুযোগ এখন ক্ষমতার রাজনীতির কাছে জিম্মি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমলাতন্ত্রের প্রভাব। শুক্রবার এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। জুলাই সনদের এক বছর পূর্তির আগের দিন এই বিবৃতি আসে। এতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা আর রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতি ছিল। আমলাতান্ত্রিক বাধার সঙ্গে আপস করেছে সেই সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর অনেকগুলো পরে বর্তমান সরকার আইনে পরিণত করেছে। কিন্তু জবাবদিহি বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে গেছে। টিআইবির চোখে সমস্যাটা তাই শুধু ধীরগতির নয়, দিক বদলেরও। যে কাঠামো ক্ষমতার ওপর নজরদারি বাড়াত, সেগুলোই আগে বাদ পড়েছে। সংস্থাটি বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংস্কার প্রক্রিয়া আইনি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
বিবৃতিতে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। টিআইবি একে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য পিছিয়ে যাওয়া পদক্ষেপ বলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশোধনী অধ্যাদেশ পাস না করে ২০০৪ সালের পুরোনো আইনে ফিরে গেছে সরকার। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের পর নতুন আইনে দায়ী সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। র্যাব বিলুপ্তির কথা বলা হলেও নতুন নামে বাহিনীটিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে দাবি টিআইবির। ঐকমত্য থাকলেও স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠিত হয়নি।
ক্ষমতাসীন দলের প্রতিশ্রুতির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে টিআইবি। দলটি ৩১ দফা কর্মসূচি আর নির্বাচনী ইশতেহারে জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। গণভোটেও সমর্থন দিয়েছিল তারা। অথচ দলটির সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে রাজি হননি। দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা ছিল। সেটিও বাস্তবায়নের স্পষ্ট লক্ষণ দেখছে না টিআইবি। সংস্থাটির অভিযোগ, “এবার আমাদের পালা” স্লোগানের আড়ালে দখল, চাঁদাবাজি আর দলীয় নিয়োগ ছড়িয়ে পড়ছে।
সাধারণ মানুষের কাছে এসব সংস্কার দূরের বিষয় নয়। আদালত, পুলিশ আর দুর্নীতি দমন কমিশন কতটা স্বাধীন, তার ওপরই নির্ভর করে ন্যায়বিচার পাওয়া। থানায় অভিযোগ করা থেকে শুরু করে মামলার রায় পর্যন্ত সবখানেই এর প্রভাব পড়ে। টিআইবির আশঙ্কা, এসব প্রতিষ্ঠান আবার আগের মতো দলীয় হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে। জুলাই সনদের এক বছর পর তাই প্রশ্নটা স্পষ্ট। যে অঙ্গীকার নিয়ে মানুষ ভোট দিয়েছিল, তা কতটা রক্ষা হবে? উত্তর মিলবে সরকারের পরের পদক্ষেপগুলোতে, বিশেষ করে বাতিল হওয়া জবাবদিহির কাঠামো ফেরানো হয় কি না, তাতে।












