রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলা, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
সোমবার, ১৯ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৯৮ ডলার বা ১ দশমিক ৮০ শতাংশ কমে ১০৭ দশমিক ৮৮ ডলারে নেমে আসে। এর আগে শুক্রবার ব্রেন্ট তেলের দাম গত ১৯ মে-এর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ১৬ ডলার বা ১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ২৫ ডলারে দাঁড়ায়। শুক্রবার এই তেলের দাম গত ১৭ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ের ফলে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে শুরু করেছেন। তবে এই দরপতন দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে রাশিয়ার প্রকৃত রপ্তানি বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিলেন ট্রাম্প
গত শুক্রবার রাশিয়ার ওপর আরোপিত গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কের ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। এর আগে গত মাসে গ্রাহাম আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন তিনি। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো ছিল ওই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা মূল্যায়নের জন্য ট্রাম্প সর্বোচ্চ ৬০ দিন সময় নেবেন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়লে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ছাড়ের সুনির্দিষ্ট শর্ত, কার্যকারিতার মেয়াদ এবং বাস্তবে কতটা জ্বালানি বাজারে আসবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ফিলিপ নোভা প্রতিষ্ঠানের বাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্রিয়াঙ্কা সচদেবার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে দেখা যেতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার কারণে সরবরাহে যে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে, নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিয়ে তা দূর করা সম্ভব নয়।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, রাশিয়ার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল হলে জ্বালানি রপ্তানি বাড়তে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে অস্পষ্টতা থাকায় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সিদ্ধান্তের বিস্তারিত শর্ত ও মেয়াদ পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বাজার পুরোপুরি বিবেচনায় নেবে না।
রাশিয়া থেকে ডিজেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা
নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়ার আগে ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে ডিজেল রপ্তানি নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলতি মাসে প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানির মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। পরে মাসিক রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৭৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে পরিকল্পিত রপ্তানির পরিমাণ আর বাস্তবে সরবরাহ হওয়া জ্বালানির পরিমাণ এক নয়। ফলে বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে চুক্তি বাস্তবায়ন, পরিবহনব্যবস্থা এবং নিষেধাজ্ঞার শর্তের ওপর।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা
রাশিয়া থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার ব্রেন্ট তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং তেল পরিবহনে বিঘ্নের আশঙ্কা এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। সাত দিনের গড় হিসাবে সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক প্রায় ৮৫ লাখ ব্যারেলে। এর আগের সপ্তাহে তা ছিল দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের বেশি।
অর্থাৎ, এক সপ্তাহের ব্যবধানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের দৈনিক প্রবাহে বড় ধরনের পতন হয়েছে। এই পরিসংখ্যান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা তুলে ধরে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত ১০টি ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই পথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদক দেশ থেকে ক্রেতাদের কাছে তেল পৌঁছাতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, আমদানি খরচ এবং বিভিন্ন দেশের জ্বালানির দামে।
সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তুতি মিসরের
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে মিসর।
দেশটি জানিয়েছে, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সৌদি আরবের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে তারা প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাতের বিস্তার ঘটলে তেল উৎপাদন, রপ্তানি এবং সমুদ্রপথে পরিবহনে নতুন বাধা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে রাশিয়া থেকে সরবরাহ বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সম্ভাবনাকে সীমিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের আগে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
ডিবিএস ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানি গবেষণা বিভাগের প্রধান সুব্রো সরকারের মতে, ইরান ও দেশটির সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির মূল্য মার্কিন ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড়সহ এসব উদ্যোগ মূলত স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা। সরবরাহের কাঠামোগত সংকট দূর করতে এগুলোর প্রভাব সীমিত হতে পারে।
সামনে তেলের বাজার কোন দিকে?
আন্তর্জাতিক তেলের বাজার এখন দুটি বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। একদিকে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ছাড় এবং ডিজেল রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের প্রবাহ কমে যাওয়া দাম বাড়ার চাপ তৈরি করছে।
ফলে সাম্প্রতিক দরপতনকে তেলের বাজারে স্থায়ী স্বস্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ এখনো সীমিত। রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বাস্তবে কতটা বাড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়, তার ওপরই আগামী দিনের বাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।












