ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ভোট চুরির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং এর মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার এমন একটি ‘লেনদেনভিত্তিক ব্যবস্থা’ গড়ে তুলেছে, যেখানে সরকারের স্বার্থে কাজ করা প্রভাবশালী ধনকুবেরদের বড় বড় চুক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
রোববার গোয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মারগাওয়ে এক জনসভায় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এসব কথা বলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী মোদি আড়াল থেকে ভোট চুরির পরিকল্পনা করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সেই পরিকল্পনা কার্যকর করেছেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তা বাস্তবায়ন করেছেন।
রাহুল দাবি করেন, এই তিন ব্যক্তি এখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। ভোট চুরির অভিযোগের জন্য তাঁদের একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং জবাবদিহি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনকে নিশানা
রাহুল গান্ধী বলেন, ভোট চুরির বিষয়টি এখন আর অস্পষ্ট নয়। এর আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকার বিরুদ্ধে নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
গোয়ায় জনসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি কংগ্রেসের ‘গোয়া রক্ষা যাত্রা’র সমাপনী কর্মসূচিতেও অংশ নেন। এ সময় দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হাঁটেন তিনি।
২০২৭ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার আহ্বান
২০২৭ সালের গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান রাহুল গান্ধী। রাজ্যের প্রতিটি এলাকায় মানুষের কাছে পৌঁছাতে দলের নেতা-কর্মীদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
রাহুল বলেন, দিল্লিতে মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই কংগ্রেস চালিয়ে যাবে। এ নিয়ে গোয়ার মানুষকে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।
নিজের বিরুদ্ধে ৪৫টির বেশি মানহানির মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন রাহুল। তাঁর দাবি, এসব মামলার কয়েকটি করেছেন মোদি ও অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ভোট চুরির সঙ্গে জড়িত, এমন অভিযোগ করার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। রাহুলের ভাষ্য, মামলা হলে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়ায় গড়াবে, আর সেই আশঙ্কা থেকেই তাঁরা মামলা করছেন না।
একাধিক রাজ্যে কারচুপির অভিযোগ
কংগ্রেসের এই নেতা দাবি করেন, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, কর্ণাটক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ভোট চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁর দল প্রমাণসহ দেখিয়েছে।
রাহুলের অভিযোগ, বিরোধী দলগুলোর ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ভোটার যুক্ত করা হয়েছে এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে। এমনকি অন্য রাজ্য থেকেও ভোটার এনে তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে জনসভায় নতুন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও জানা যায়নি।
আদানি-আম্বানি ও গোয়া সরকার প্রসঙ্গ
বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে শিল্পপতি গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করেন রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, অবকাঠামো প্রকল্পসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগ প্রভাবশালী ধনকুবেরদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
গোয়ার বিজেপি সরকারকে আক্রমণ করে রাহুল বলেন, রাজ্যটিতে বেকারত্ব পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ এবং কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণদের বিদেশে চলে যেতে হচ্ছে। একসময় মোদির উন্নয়ন মডেল হিসেবে ‘গুজরাট মডেল’ প্রচার করা হতো, কিন্তু গোয়ায় এখন দুর্নীতির একটি বিশেষ মডেল তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা খাত নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। দিল্লিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের নিন্দা জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে রাহুল প্রশ্ন তোলেন, বহুল আলোচিত ‘৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি’ এখন কোথায়। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে রাজ্যে কংগ্রেসের সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন রাহুল গান্ধী।












