দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ঘিরে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এবার সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়ে দ্বীপগুলোর অর্থনীতি, বিশেষ করে সম্ভাবনাময় তেলশিল্প ও মৎস্য খাতকে লক্ষ্য করে চাপ বাড়াচ্ছে আর্জেন্টিনা। এতে মাত্র কয়েক হাজার মানুষের এই ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দ্বীপের আইনসভার সদস্য লুইস ক্লিফটনের মতে, ১৯৮২ সালের যুদ্ধের পর থেকে আর্জেন্টিনার দিক থেকে এবারের চাপ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আর্জেন্টিনার অবস্থান আগের চেয়ে কঠোর ও সংঘাতমুখী, যা দ্বীপগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তেলশিল্প ঘিরে নতুন সংঘাত
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ফকল্যান্ডের তেলশিল্পে জড়িত কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। দ্বীপগুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস মৎস্যশিল্পের বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্বীপের উত্তরে সমুদ্রের গভীরে সি লায়ন তেল প্রকল্প এই বিরোধকে আরও জটিল করেছে। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান নাভিটাস এবং তাদের ব্রিটিশ অংশীদার রকহপার এক্সপ্লোরেশন প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছে। স্বাধীন মূল্যায়ন অনুযায়ী, উৎপাদন শুরু হলে দ্বীপগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন তিন গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং নরওয়ের আদলে একটি সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা কয়েক মাসের মধ্যে খননকাজ শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী। তবে আর্জেন্টিনার চাপের প্রভাব এরই মধ্যে পড়েছে: প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দুটি বড় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি সরে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা কতটা
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দখল করেছিল আর্জেন্টিনা। এখন সেখানে যুক্তরাজ্যের সামরিক উপস্থিতি থাকায় সরাসরি হামলার আশঙ্কা তুলনামূলক কম বলে মনে করা হচ্ছে। মাউন্ট প্লেজ্যান্ট বিমানঘাঁটিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ সামরিক সদস্য রয়েছেন। রয়েছে টাইফুন যুদ্ধবিমান, স্থলভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং টহল জাহাজ এইচএমএস মেডওয়ে।
যুক্তরাজ্য দ্বীপবাসীর ব্রিটিশ পরিচয় বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডসহ রাজনৈতিক নেতারা আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষতি মোকাবিলায় আইনগত সুরক্ষার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। বিরোধসংক্রান্ত গ্রেপ্তারের বিষয়ে আর্জেন্টিনার একটি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে ইন্টারপোলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর।
তবু লন্ডনের ওপর দ্বীপবাসীর আস্থায় ঘাটতি রয়েছে। অনেকের ধারণা, ১৯৮২ সালের আগে লন্ডনের উদাসীনতাই আর্জেন্টিনাকে আক্রমণের সুযোগ দিয়েছিল।
যুদ্ধের স্মৃতি এখনো তাড়া করে
১৯৮২ সালের যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং যুক্তরাজ্যের ২৫৫ জন সামরিক সদস্য নিহত হন, প্রাণ হারান ফকল্যান্ডের তিনজন বাসিন্দাও। ফকল্যান্ড সরকারের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা আন্দ্রেয়া ক্লজেন তখন ১০ বছরের শিশু, পরিবারের সঙ্গে ছিলেন গুজ গ্রিন এলাকায়। দ্রুতগতির যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনলে এখনো তাঁর অস্বস্তি হয়।
দ্বীপের প্রবীণ বাসিন্দা মাইক সামার্স বলেছেন, যুদ্ধের মানসিক আঘাত অনেকে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন। আর্জেন্টিনা আবার আক্রমণ করতে পারে, এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ বাড়ি বিক্রি করে চলে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
স্কুইডে বদলে যাওয়া অর্থনীতি
যুদ্ধের সময় ফকল্যান্ডে বাস করতেন প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ, অর্থনীতি ছিল মূলত ভেড়ার পশমনির্ভর। এখন জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৬০০, বছরে বাড়ছে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। প্রায় ৭০টি দেশের মানুষ সেখানে থাকেন; ভালো বেতন, কর্মসংস্থান এবং সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ আয়কর তাঁদের আকৃষ্ট করছে। সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ফিলিপাইনের নাগরিকেরা।
এই রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা স্কুইড আহরণ ও রপ্তানির। ১৯৮৬ সালে উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচেটিয়া মৎস্য আহরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হয়। স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের জাহাজকে লাইসেন্স দিয়ে বড় রাজস্ব আয় করেছে দ্বীপ সরকার। ফলে মাথাপিছু জিডিপি ১৯৮২ সালের প্রায় ২ হাজার পাউন্ড থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ৮৫ হাজার পাউন্ডে পৌঁছেছে। এই হিসাবে বিশ্বে ফকল্যান্ডের অবস্থান ষষ্ঠ, নরওয়ের ঠিক পেছনে। প্রতিবছর ৭৫ হাজার বা তার বেশি পর্যটক প্রমোদতরিতে স্ট্যানলি বন্দরে আসেন।
তবে দ্বীপের বৃহত্তম মৎস্য কোম্পানি ফরচুনার প্রধান নির্বাহী জেমস ওয়ালেস জানিয়েছেন, স্কুইড আহরণে বড় ওঠানামা দেখা যাচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে আহরণ কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে তেল প্রকল্পের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
বিচ্ছিন্ন দ্বীপের দৈনন্দিন সংকট
সমৃদ্ধি সত্ত্বেও ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের জীবনে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সীমিত পণ্য পরিবহনে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দেয়। একসময় দুধ, এমনকি বিয়ারের ঘাটতিও হয়েছিল। চেরি টমেটোর সংকটে একটি সুপারমার্কেট টমেটো অর্ধেক করে বিক্রি করেছিল। একটি বাঁধাকপির দাম ৮ পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। কোনো বাস সার্ভিস নেই, আর ওয়েলসের প্রায় অর্ধেক আয়তনের এই ভূখণ্ডে নগদ টাকা তোলার যন্ত্র মাত্র একটি।
স্থানীয় হাসপাতাল জটিল আঘাতের চিকিৎসা দিতে পারে না বলে পূর্ণাঙ্গ রাগবির বদলে টাচ রাগবি খেলা হয়। স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ যায় রোগীদের দক্ষিণ আমেরিকায় নেওয়ায়। ১৬ বছরের পর শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে পড়তে পাঠানোর খরচ সরকার বহন করে, আর তাঁদের বেশির ভাগই পরে ফিরে আসেন।
নিজস্ব পরিচয়ের লড়াই
আইনসভার সদস্য স্টেসি ব্র্যাগার মনে করেন, দ্বীপবাসীর পরিচয় ব্রিটিশ হলেও নিজের প্রয়োজন নিজে মেটানো এবং প্রতিকূলতায় টিকে থাকার দক্ষতা তাঁদের আলাদা বৈশিষ্ট্য। পেবল আইল্যান্ডের মালিক ও আইনসভার সদস্য ডট গোল্ডের মতে, ১৯৮২ সালের পর বর্তমান সময় তাঁদের জন্য সবচেয়ে গুরুতরগুলোর একটি।
পরিবারের ইতিহাস ১৮৪২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত রক্সি কিং-ক্লার্ক বলেন, দ্বীপবাসীকে দখলদার ও উপনিবেশবাদী বলা হয়, অথচ তাঁর পূর্বপুরুষ ১৮৪২ সালেই সেখানে এসেছিলেন।
তেলশিল্প চালু হলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু প্রকল্পে বাধা, বিনিয়োগকারীদের সরে যাওয়া বা বিরোধ তীব্র হলে সেই সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বীপবাসীর কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।












