শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেটের ব্যবহার যত বাড়ছে, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, মেজাজের পরিবর্তন এবং অনলাইন আসক্তির ঝুঁকিও তত বাড়ছে। ভারতের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, শিশুরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেও অনলাইনের ঝুঁকি চেনা, প্রভাবিত করার কৌশল বোঝা এবং নিজেদের নিরাপদ রাখার মতো দক্ষতায় অনেকেই পিছিয়ে।
ভারতীয় সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের সহায়তায় পরিচালিত এ গবেষণায় শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল
‘ডিজিটাল যুগে শিশুদের ক্ষমতায়ন: বিকশিত ভারত ভাবনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণাটি ২০২৫ সালে পরিচালিত হয়। এতে দিল্লির বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী দুই হাজারের বেশি শিশুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় ৫০০ অভিভাবকের মতামতও সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু বাড়ি থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। প্রধান মাধ্যম স্মার্টফোন। শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ইন্টারনেটে কাটায়। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য পড়াশোনা। এরপর রয়েছে অনলাইন গেম, ভিডিও দেখা এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত উত্তর প্রদেশের বেনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মইনা খান বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিশুদের তথ্য সংগ্রহ, নতুন দক্ষতা অর্জন, দলগতভাবে শেখা, সামাজিক যোগাযোগ এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অনলাইনে পাওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই এবং ডিজিটাল পরিবেশের ঝুঁকি বোঝার মতো দক্ষতায় তারা পিছিয়ে।
দক্ষতা থাকলেই নিরাপত্তা নয়
অনেক অভিভাবক মনে করেন, শিশুরা প্রযুক্তিতে তাঁদের চেয়ে বেশি দক্ষ এবং অনলাইনের বিষয়গুলো নিজেরাই বোঝে। গবেষণা বলছে, এই ধারণা সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়। অ্যালগরিদম কীভাবে তাদের পছন্দ ও আচরণকে প্রভাবিত করে, কীভাবে নানা কৌশলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখা হয়, আর কীভাবে তাদের দুর্বলতা কাজে লাগানো হতে পারে, এসব বিষয়ে অনেক শিশুরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
অংশ নেওয়া অনেক শিশু জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারলে তাদের একাকী লাগে। পছন্দের কিছু খুঁজে না পেলে তারা রেগে যায়। আবার ব্যবহার বন্ধ করতে চাইলেও অনেক সময় পারে না। গবেষকদের মতে, এগুলো নিয়ন্ত্রণ হারানোর লক্ষণ হতে পারে এবং আসক্তির ঝুঁকি নির্দেশ করে।
অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ
অংশ নেওয়া প্রায় ৪৭ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, আগের ছয় মাসে তারা অনলাইনে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলেছে। অনেকে অপরিচিতদের সঙ্গে অনলাইন গেমও খেলেছে। বিশেষ করে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের মধ্যে অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বয়সের অনুপযোগী বিষয়বস্তু দেখার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
কয়েকজন শিশু সাইবার হয়রানি এবং অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছে। তবে অস্বস্তিকর বা অনিরাপদ অভিজ্ঞতার পর বেশির ভাগ শিশু অভিভাবক বা শিক্ষককে তা জানায়নি। ফলে অনলাইনে হয়রানি বা শোষণের অনেক ঘটনা পরিবারের অজানা থেকে যেতে পারে।
ছেলে ও মেয়েদের ব্যবহারে পার্থক্য
সাধারণভাবে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় বেশি সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, বেশি সামাজিক স্বাধীনতার কারণে ছেলেদের ইন্টারনেট ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে কম নিয়ন্ত্রিত থাকে, এতে ক্ষতিকর বিষয়বস্তুর মুখে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। অন্যদিকে মেয়েদের ওপর বেশি বিধিনিষেধ থাকলে তাদের ডিজিটাল দক্ষতা ও নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা গড়ে উঠতে বাধা পায়।
পরিবার ও বিদ্যালয়ের ভূমিকা
গবেষণায় শিশুদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে নিরাপদ থাকা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি, সাইবার হয়রানি চেনা এবং ক্ষতিকর বিষয়বস্তু থেকে দূরে থাকা নিয়ে শিশুদের সচেতন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়গুলো পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা দিতে পারে। গবেষকদের মতে, শিশুদের ডিজিটাল জগৎ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রযুক্তির সুফল নেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিরাপদ করতে পরিবার, বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগই কার্যকর পথ বলে মনে করছেন গবেষকেরা।












