মহাবিশ্বের জন্মের পর পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সমান পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকলে একসময় তাদের পরস্পরকে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে পরমাণু, নক্ষত্র, গ্রহ কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব গড়ে ওঠার সুযোগই থাকত না। কিন্তু বাস্তবে মহাবিশ্ব পদার্থে পরিপূর্ণ। পৃথিবী থেকে শুরু করে সূর্য, ছায়াপথ এবং মানুষের শরীর, সবকিছুই সেই পদার্থ দিয়ে গঠিত। প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাংয়ের পর কীভাবে পদার্থ প্রতিপদার্থের বিনাশ থেকে রক্ষা পেয়েছিল, পদার্থবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের এই রহস্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় এমন এক ভারী নিউট্রিনোর ভূমিকা উঠে এসেছে, যা আগে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ঋষভ রোশন এবং ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি কানপুরের সুদীপ্ত শো এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্সে। গবেষকদের প্রস্তাবিত ব্যাখ্যাটি সঠিক হলে, মহাবিশ্বের প্রথম মুহূর্তগুলোতে কিছু মৌলিক কণার অপ্রত্যাশিত ভূমিকা পদার্থের টিকে থাকা এবং পরবর্তী সময়ে নক্ষত্র ও ছায়াপথ গঠনের পথ তৈরি করে থাকতে পারে।
পদার্থ ও প্রতিপদার্থের অসম লড়াই
বিগ ব্যাংয়ের প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে পদার্থের পাশাপাশি প্রতিপদার্থও তৈরি হয়েছিল। প্রতিপদার্থের কণার ভর সাধারণ পদার্থের সংশ্লিষ্ট কণার সমান হলেও তাদের বৈদ্যুতিক আধান বিপরীত হতে পারে। কোনো পদার্থকণা ও তার প্রতিপদার্থের কণা পরস্পরের সংস্পর্শে এলে তারা বিলুপ্ত হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
মহাবিশ্বের জন্মের সময় পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সমান পরিমাণে তৈরি হয়ে থাকলে তাদের পারস্পরিক বিনাশের পর কেবল বিকিরণ অবশিষ্ট থাকার কথা। সে ক্ষেত্রে আজকের পরিচিত মহাবিশ্বের পরমাণু, নক্ষত্র, গ্রহ কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ত।
বাস্তবে পদার্থ টিকে গেছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে পদার্থের পক্ষে সামান্য ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিল। প্রতিপদার্থের তুলনায় পদার্থের এই ক্ষুদ্র আধিক্যই পরবর্তী সব গঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু কীভাবে এই পার্থক্য তৈরি হলো এবং কীভাবে তা টিকে থাকল, সেই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
রহস্যের কেন্দ্রে উপেক্ষিত ভারী নিউট্রিনো
গবেষকদের প্রস্তাবিত ব্যাখ্যার কেন্দ্রে রয়েছে ভারী নিউট্রিনোর একটি বিশেষ ধরন, যাকে বলা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন ভারী নিউট্রিনো। নিউট্রিনো এমন এক ধরনের অতিপারমাণবিক কণা, যার বৈদ্যুতিক আধান নেই এবং ভর অত্যন্ত কম। অন্যান্য কণার সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়াও দুর্বল হওয়ায় একে শনাক্ত করা কঠিন।
সাধারণ নিউট্রিনোর পাশাপাশি আরও বেশি ভরবিশিষ্ট নিউট্রিনো থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। রোশন ও তাঁর সহকর্মীদের ব্যাখ্যায়, ভারী নিউট্রিনোর দুটি ধরন মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ে পদার্থের আধিক্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আরেকটি বিশেষ ধরনের ভারী নিউট্রিনো সেই আধিক্য টিকে থাকার পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই বিশেষ কণাটি অন্যান্য কণার সঙ্গে এত দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে যে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে। আগে একে কণা পদার্থবিজ্ঞানের তুলনামূলক গুরুত্বহীন পটভূমিগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন গবেষণায় এর সম্ভাব্য ভূমিকা সামনে এসেছে।
মহাবিশ্বের প্রসারণ ও শীতল হওয়ার গতিতে প্রভাব
গবেষণার মূল ধারণা হলো, বিচ্ছিন্ন ভারী নিউট্রিনো দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থেকে মহাবিশ্বের শক্তির ঘনত্বে সাময়িকভাবে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে। এর ফলে মহাবিশ্বের প্রসারণ ও শীতল হওয়ার স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন ঘটেছিল বলে গবেষকেরা মনে করছেন।
মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কণার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু এই বিশেষ নিউট্রিনোর উপস্থিতি শীতল হওয়ার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে থাকলে সেই মিথস্ক্রিয়াগুলোর সময়ও পিছিয়ে যেতে পারে। গবেষকদের ব্যাখ্যায়, এই অতিরিক্ত সময় পদার্থকে প্রতিপদার্থের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিনাশ হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করেছিল।
ঋষভ রোশনের মতে, বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার সময় এই কণাটি যথেষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে সাময়িকভাবে মহাবিশ্বের শক্তির ঘনত্বে প্রাধান্য পেতে পারত। এর ফলে এমন একটি পর্যায় তৈরি হতে পারে, যখন মহাবিশ্বের বিবর্তনে পদার্থের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রথম পরমাণুর উপাদান তৈরির পথ
বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্ব দ্রুত প্রসারিত ও শীতল হতে থাকে। পদার্থ টিকে থাকার পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল হালকা মৌলের নিউক্লিয়াস তৈরি হওয়া। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই আধুনিক মহাবিশ্বের পদার্থ গঠনের প্রাথমিক উপাদানগুলো তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস ছিল অন্যতম। প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার বছর পর মহাবিশ্ব আরও ঠান্ডা হলে ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ পরমাণু তৈরি করতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব পদার্থ থেকে প্রথম নক্ষত্রের জন্ম হয়।
অর্থাৎ পদার্থের সামান্য আধিক্য তৈরি হওয়া এবং সেই আধিক্য টিকে থাকা ছিল মহাবিশ্বের পরবর্তী বিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গবেষণাটি এই দুই ধাপের মধ্যে একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র তুলে ধরেছে।
এখনো তাত্ত্বিক, প্রমাণের অপেক্ষায়
তবে গবেষণায় আলোচিত বিশেষ ভারী নিউট্রিনোর অস্তিত্ব এখনো পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত হয়নি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই কণাগুলো মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থায় আর টিকে নেই। ফলে সরাসরি শনাক্ত করার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
তবু গবেষকেরা মনে করছেন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মধ্যে এই কণাগুলোর প্রাচীন প্রভাবের চিহ্ন পাওয়া সম্ভব হতে পারে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হলো স্থান-কালের বুননে সৃষ্ট তরঙ্গ, যা মহাবিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী ঘটনার তথ্য বহন করে। ভবিষ্যতে এসব তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকদের প্রস্তাবিত তত্ত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ খোঁজা যেতে পারে।
গবেষণাটি মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। তবে পদার্থ কেন প্রতিপদার্থের তুলনায় টিকে গেল, সেই প্রশ্নের সম্ভাব্য ব্যাখ্যায় নতুন একটি পথ খুলে দিয়েছে। এই ধারণা পরীক্ষায় টিকে গেলে মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে বর্তমানে পরিচিত কণার বাইরেও আরও বিস্তৃত মৌলিক কণার ভূমিকা বিবেচনা করতে হতে পারে।
মহাবিশ্বের অস্তিত্বের অন্যতম মৌলিক রহস্যের সমাধান এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু যে কণাকে একসময় গুরুত্বহীন বলে মনে করা হয়েছিল, সেটিই হয়তো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করবে কেন মহাবিশ্ব শূন্যতায় পরিণত না হয়ে পদার্থ, নক্ষত্র, গ্রহ এবং প্রাণের আবাসস্থল হয়ে উঠেছে।












