ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মধ্যে ধর্মীয় মতাদর্শে গভীর পার্থক্য রয়েছে। হুতিরা জাইদি শিয়া মতবাদের কঠোর ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। অন্যদিকে আল-কায়েদা ও আইএসের উত্থান হয়েছে উগ্রপন্থী সুন্নি আন্দোলন থেকে। মতাদর্শগত বিরোধের কারণে বিভিন্ন সময়ে এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষও হয়েছে। কিন্তু শুধু হামলার সংখ্যা কিংবা সহিংস বক্তব্য দিয়ে তাদের দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মাত্রা বিচার করা যায় না। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, অনুসারীদের সংগঠিত করা এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে হুতিদের হুমকি আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কারণ, তাদের আন্দোলন শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে টিকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ধর্মীয় বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে শাসনের দাবি, উত্তর ইয়েমেনের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ধারাবাহিক সমর্থন। উত্তরাঞ্চলের সাদা প্রদেশে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই গোষ্ঠী এখন ইয়েমেনের রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
ধর্মীয় উত্তরাধিকার থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের দাবি
হুতিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বুঝতে হলে ইয়েমেনের জাইদি ইমামত ব্যবস্থার ইতিহাস বিবেচনা করতে হয়। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিরতি দিয়ে উত্তর ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ব্যবস্থা শাসন করেছে।

প্রচলিত জাইদি রাজনৈতিক চিন্তায় ইমাম হওয়ার যোগ্যতা মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) নাতি হাসান ও হুসাইনের বংশধরদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পাশাপাশি অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের নেতৃত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। হুতিরা এই ঐতিহ্যের নির্বাচিত অংশ ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে।
তবে সব জাইদি মুসলমান হুতিদের মতাদর্শ সমর্থন করেন না। জাইদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে বিভিন্ন চিন্তাধারা রয়েছে, আর বিশিষ্ট কিছু জাইদি আলেম হুতিদের মতাদর্শের কট্টর রূপান্তরের বিরোধিতাও করেছেন। ফলে হুতিদের রাজনৈতিক প্রকল্পকে পুরো জাইদি সম্প্রদায়ের অবস্থান হিসেবে দেখা যথাযথ নয়।
হুতিদের আদর্শে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ভাষা ও রাজনৈতিক ধারণার প্রভাবও রয়েছে। যদিও জাইদি ইমামত এবং ইরানের ধর্মীয় নেতার অভিভাবকত্বভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এক নয়, উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় কর্তৃত্বকে সাধারণ রাজনৈতিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। হুতিদের ক্ষেত্রে এই ধারণা রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করেছে: রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি কি নাগরিকত্ব, নির্বাচন ও জাতীয় ঐকমত্য, নাকি বিশেষ ধর্মীয় বংশপরিচয়?
ধর্মীয় আন্দোলন থেকে সানা দখল
আধুনিক হুতি আন্দোলনের শিকড় ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে গড়ে ওঠা ‘বিশ্বাসী তরুণ’ নেটওয়ার্কে। হুসেইন বদর আল-হুতি ও তাঁর বাবা বদর আল-দিন এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে আন্দোলনটি ইরানের বিপ্লবী আদর্শ এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা থেকে প্রভাব গ্রহণ করে।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রভাবশালী জাইদি আলেম মাজদ আল-দিন আল-মুয়াইয়াদিসহ কয়েকজন ধর্মীয় নেতা আল-হুতি পরিবারের মতাদর্শগত দিক পরিবর্তন ও আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিকীকরণের বিরোধিতা করেন। এতে জাইদি ধর্মীয় পুনর্জাগরণ এবং সশস্ত্র রাজনৈতিক প্রকল্পের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে হুতিদের একাধিক যুদ্ধ হয়। দম্মাজে সালাফি প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের পর তারা আমরান অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সম্প্রসারণ করে। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে আন্দোলনটি।

২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ইয়েমেনে রাজনৈতিক সমঝোতার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, হুতিদের উত্থান তার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থিত রাজনৈতিক উদ্যোগ, জাতীয় সংলাপ সম্মেলন এবং শান্তি ও জাতীয় অংশীদারত্ব চুক্তি কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।
হুতিরা প্রয়োজনে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহের সঙ্গে তাদের জোটও হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সালেহ নিহত হন। ঘটনাটি দেখায়, হুতিরা কৌশলগত জোট গড়তে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি।
ইরানের সমর্থনে আঞ্চলিক শক্তি
ইরানের সামরিক, আর্থিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক সমর্থন হুতিদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। স্থানীয় ধর্মীয় সমর্থনের ওপর নির্ভর করে যে ধরনের সামরিক ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা কঠিন হতো, এই সহযোগিতা তার সুযোগ তৈরি করেছে। হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক ও সামরিক অভিজ্ঞতাও হুতিদের জন্য প্রভাবশালী উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে।
হুতিদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান তাদের অভ্যন্তরীণ সমর্থকদের সংগঠিত করার পাশাপাশি ইয়েমেনের বাইরেও সংঘাতের পরিসর তুলে ধরে। সৌদি আরব তাদের কৌশলগত হিসাবের কেন্দ্রীয় প্রতিপক্ষ। দেশটি একদিকে ইয়েমেনের প্রতিবেশী, অন্যদিকে হুতিদের অস্ত্র ও আঞ্চলিক তৎপরতার কারণে সরাসরি নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে রয়েছে। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারেরও প্রধান সমর্থকদের একটি।
রাষ্ট্রীয় মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হুতিদের অন্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠী থেকে আলাদা করেছে। তারা শুধু গোপনে সক্রিয় কোনো সশস্ত্র নেটওয়ার্ক নয়; নিয়ন্ত্রিত এলাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আল-কায়েদার সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগের প্রশ্ন
হুতি ও আল-কায়েদার মধ্যে ধর্মীয় বিরোধ গভীর হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে কৌশলগত স্বার্থ কখনো কখনো সেই বিরোধকে ছাপিয়ে যেতে পারে। উভয় গোষ্ঠীই যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের শত্রু হিসেবে তুলে ধরে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং তার সমর্থক বাহিনীও তাদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুতি ও আরব উপদ্বীপভিত্তিক আল-কায়েদার মধ্যে সুযোগসন্ধানী সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল। বন্দি বিনিময়, পারস্পরিক সমঝোতা, গোয়েন্দা যোগাযোগ এবং অস্ত্র স্থানান্তর নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে তথ্য এসেছে, সেগুলোও দুই পক্ষের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এসব তথ্যকে স্থায়ী জোট, অভিন্ন নেতৃত্ব বা পূর্ণ মতাদর্শগত ঐক্যের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। সম্পর্কটি অস্পষ্ট ও লেনদেননির্ভর; যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বদলালে তাদের স্বার্থও বদলাতে পারে।

ইরানের সঙ্গে আল-কায়েদার অতীত যোগাযোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা তদন্তকারী কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে আল-কায়েদার জ্যেষ্ঠ সদস্যরা ইরানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে আরেকটি প্রতিনিধি দল লেবাননের বেকা উপত্যকায় প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালে আয়মান আল-জাওয়াহিরি নিহত হওয়ার পর আল-কায়েদার কার্যত প্রধান হিসেবে বিবেচিত সাইফ আল-আদেলের ইরানে অবস্থান ও ইয়েমেন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও গবেষণা হয়েছে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণায় ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে তাঁর ভূমিকার কথা এসেছে। তবে এসব যোগাযোগের প্রকৃত ব্যাপ্তি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
হুমকির ধরনেই মূল পার্থক্য
আল-কায়েদা আন্তর্জাতিক জিহাদি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চেয়েছে। আইএস ইরাক ও সিরিয়ায় ভূখণ্ড দখল করে তথাকথিত খেলাফত ঘোষণা করেছিল, যদিও পরে তাদের প্রধান ঘাঁটিগুলো হারাতে হয়। উভয় গোষ্ঠীই ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
হুতিদের প্রকল্প ভিন্ন ধরনের। তারা এমন একটি দেশে সক্রিয়, যেখানে ইমামত শাসনের ঐতিহাসিক স্মৃতি রয়েছে। ধর্মীয় বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক বৈধতার দাবি তুলে তারা বিদ্যমান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ইরানের সহায়তায় প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্যও হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
তাই হুতিদের আল-কায়েদা বা আইএসের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলার অর্থ তাদের সহিংসতার পরিমাণ তুলনা করা নয়। বরং তাদের রাজনৈতিক প্রকল্প কতটা দীর্ঘস্থায়ী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সেটিই মূল বিবেচনা।
ইয়েমেন ও তার প্রতিবেশীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাবি, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে। কারণ, এমন হুমকি শুধু বিচ্ছিন্ন হামলা বা জঙ্গি নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র, নাগরিকদের সমান অধিকার এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করতে পারে।












