ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দাঙ্গা ও সহিংসতায়। স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকের সংকট, শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে দেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদে পাঁচ থেকে আট লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিক্ষোভে শতাধিক পুলিশ সদস্যসহ বহু আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশাপাশি ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চাপে পড়লেও এর রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন।
স্কুলের দুরবস্থা থেকে আন্দোলনের বিস্তার
গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের আবাসিক এলাকা ক্রেতেইয়ে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। তাদের অভিযোগ, স্কুলের অবকাঠামো জরাজীর্ণ, শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে এবং ক্লাসের সময়সূচি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত অসুবিধাজনক। ফ্রান্সের অনেক স্কুলে সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ক্লাস চলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শনিবার সকালেও ক্লাস করতে হয়।
গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাব সেপ্টেম্বরেও শ্রেণিকক্ষে অনুভূত হচ্ছিল। অথচ অনেক স্কুলে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনপ্রক্রিয়া পরিচালনাকারী অনলাইন ব্যবস্থা পারকুরসুপ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থায় অদক্ষতা ও বৈষম্যের কারণে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শিক্ষকদের অনেকেও শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত। বড় শ্রেণিকক্ষ, দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা ও তুলনামূলক কম বেতন নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। তবে আন্দোলন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, তা প্রত্যাশিত ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে আরও প্রায় ৭০০টি স্কুলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬৮ সালের আন্দোলনের সঙ্গে মিল
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৬৮ সালের মে মাসের ছাত্র আন্দোলনের কিছু মিল রয়েছে। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সনাতন শিক্ষাব্যবস্থা ও রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, সমাজে সুযোগ সীমিত এবং প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাস মানুষের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে একই ধরনের হতাশা দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মধ্য-ডানপন্থী সরকার কিংবা সম্ভাব্য ডানপন্থী উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত মেরিন লে পেনের দল, কোনোটিই অনেক তরুণের কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও সাম্প্রতিক ছাত্র ও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, অসন্তোষ শুধু ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ নয়। স্পেনে বড় বিক্ষোভগুলোর অন্যতম কারণ সাশ্রয়ী আবাসনের সংকট। ২০২০ সালের পর মহামারির বিধিনিষেধ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসনসংকটের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতা
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, তাদের সমর্থক, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। মুখঢাকা একদল তরুণ, যাদের ফরাসি ভাষায় ‘কাস্যর’ বলা হয়, দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে।
লিমোজ শহরের পৌর ভবন ও লিয়ঁর ঐতিহাসিক পর্যটন কার্যালয়ের মতো স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও সরকারি ভবন এবং লুট হয়েছে শত শত দোকান। অতীতেও শ্রমিক আন্দোলন ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় বিক্ষোভের একাংশ সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। তবে এসব ভাঙচুর ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের গণবিক্ষোভের ঐতিহ্যের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
লে পেনের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ
২০২৭ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। দেশটির রাজনীতি মূলত তিনটি পরস্পরবিরোধী শিবিরে বিভক্ত: চরম ডানপন্থী, মধ্য-ডানপন্থী এবং চরম বামপন্থী।
লে পেন ও অন্যান্য ডানপন্থী নেতা স্কুলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পুলিশের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সহিংসতাকারীদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে বহিষ্কারের দাবিও তুলেছেন তারা। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশে ঘটে যাওয়া সহিংসতা লে পেনের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, বিক্ষোভের প্রতি জোরালো সমর্থন জানানো জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ও তাঁর বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজ’-এর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। সহিংসতার কারণে জনসমর্থন কমে গেলে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিও আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন, মাখোঁর চাপে থাকা সরকার শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির জবাব কীভাবে দেয়। শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যার সমাধান এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে ফ্রান্সের সামাজিক ক্ষোভ আরও গভীর হতে পারে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এখন আর শুধু স্কুলের দুরবস্থার প্রতিবাদ নয়; জীবনযাত্রার ব্যয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বিভাজনেরও প্রতিফলন। তবে সহিংসতা বাড়তে থাকলে আন্দোলনের মূল দাবিগুলো চাপা পড়ে ডানপন্থীদের রাজনৈতিক লাভের পথ তৈরি হতে পারে।












