বিশ্ববাজারে এক বছরে গমের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। যুদ্ধের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং এল নিনোর প্রভাবে খরা ও ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি বছরের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে ২০২৭ সালজুড়েও খাদ্যের বাড়তি দামের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
খাদ্যপণ্যের বাজারে বাড়ছে চাপ
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এসব অঞ্চলের বহু পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য মূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটি সর্বোচ্চ অবস্থান। সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, সরবরাহব্যবস্থায় একাধিক সংকট একসঙ্গে তৈরি হওয়ায় খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ বাড়ছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালেই এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
যুদ্ধ ও পরিবহন সংকটে বাড়ছে গমের দাম
কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিকল্প সরবরাহের ওপর নির্ভরতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে। জ্বালানি ও সারের বাড়তি খরচ কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য পরিবহন পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তুলছে।
এল নিনোর প্রভাবে ফসল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা
আবহাওয়ার পরিবর্তনও খাদ্যবাজারে চাপ বাড়াচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়া ফসল উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ।
ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে শুরু হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এতে দেশটির খাদ্যবাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বাজারের উদ্বেগ দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
মিসর, আমিরাত ও ভারতেও মূল্যবৃদ্ধি
মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় রুটির দাম গত জুলাইয়ের চার পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
ভারতেও ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্যের বাজারে। সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দেশটিতে চিনির দামও সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুদ্ধ, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সরবরাহব্যবস্থার সংকট দ্রুত না কমলে আগামী বছরও খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।












